এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত অন্তত অর্ধ হাজার শিক্ষার্থী ফেনীতে এইচএসসিতে ফেল করায় নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনের পর তারা জেলার সেরা বিদ্যাপীঠ ফেনী সরকারি, ফেনী সরকারি জিয়া মহিলা কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু খ্যাতিমান এসব কলেজে পড়াশোনার পরও এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক পোস্ট করা হচ্ছে। তারা এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি কিছুতেই মানতে পারছেন না।
আরিফুল ইসলাম নামের এক গণমাধ্যম কর্মী তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন, ফেনীতে সবচেয়ে বেশি খারাপ ফলাফল করেছে ফেনী সরকারি কলেজ। এ কলেজে ফেল করেছে ২৯৭ জন, সরকারি জিয়া মহিলা কলেজে ফেল করেছে ২৩২ জন, মহিপাল সরকারি কলেজে ফেল করেছে ২৬৯ জন আর জয়নাল হাজারি কলেজে ফেল করেছে ৩৬৫ জন।
তিনি তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, ফেনী সরকারি কলেজে যারা এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছেন তাদের মাঝে সবার এসএসসিতে জিপিএ ছিল ৪ দশমিক ৫০ এর উপরে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ছিল জিপিএ-৫ প্রাপ্ত। আর যাদের এসএসসিতে জিপিএ ছিল ১ অথবা ২ তারা ভর্তি হয়েছে বিভিন্ন প্রাইভেট কলেজে।
তিনি একটি প্রাইভেট কলেজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ওই কলেজের ৪৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে মাত্র ২১ জন ফেল করছে। অথচ এসএসসির ফলাফলে এরা ছিল একেবারেই দুর্বল। যাদের জিপিএ কম থাকায় সরকারি কলেজে পড়াশোনার সুযোগ বঞ্চিত ছিল।
একদিকে সরকারি নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবীদের অকৃতকার্য করে তুলছে, অন্যদিকে বেসরকারি প্রাইভেট কলেজগুলো তুলনামূলক ঝরে যাওয়া শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
শুধু আরিফুর রহমানই নয়; ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই ফেনীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক স্ট্যাটাস ভাসছে। মেধাবীদের ফেল করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানকেই দুষছেন তারা। কেউ কেউ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোলনের পথও বাতলিয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ফেনীতে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ধস নেমেছে। গত বছর ফেনীতে ৬১ ভাগ পাশের হার থেকে নেমে এবার দাঁড়িয়েছে ৪৮ ভাগে। জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও নেমে এসেছে অর্ধেকে। বিশেষ করে জেলার খ্যাতিমান কলেজগুলোতে অকৃতকার্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, এবারের ফলাফলে ফেনী সরকারি কলেজের ২৯৭ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। অকৃতকার্যদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে জেলার সেরা বিদ্যাপীঠ ফেনী সরকারি কলেজে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করে ছিল। কিন্তু এসএসসিতে মেধাবীর স্বাক্ষর রাখা এবং সেরা কলেজে পড়েও এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিকে নিছক শিক্ষার্থীর দোষ নয়; এ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন প্রশ্ন উঠেছে। একই অবস্থা ফেনী সরকারি জিয়া মহিলা কলেজেও দেখা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পতিত সরকারের সময় পড়ালেখা না করেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করায় শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের পড়ালেখা বিমুখিতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যথাযথ ফলাফল ঘোষণা করায় প্রকৃত চিত্রটি মানুষ জানতে পারছে।
গত বছরের ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জেলায় ১০ হাজার ৯৩৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৬ হাজার ৭৪১ জন কৃতকার্য হয়। ওই বছর পাশের হার ছিল ৬১ দশমিক ৬৫ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫৩৯ জন। কিন্তু এবার ফেনী জেলার ৬টি উপজেলা থেকে এবার ৪২টি কলেজের ১০ হাজার ৩৫৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মাঝে ৫ হাজার ৪৪ জন কৃতকার্য হয়েছে। জেলায় পাশের হার ৪৮ দশমিক ৭২, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৪৪ জন। ফলাফলের দিক থেকে অকৃতকার্যের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন দেখা গেছে।
ফেনীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক তায়বুল হক বলেন, মূলত ২ কারণে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিম্নমুখী হয়েছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় আন্দোলন করে একটি সরকারকে উৎখাত করেছে। কিন্তু ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার টেবিলে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, বিগত সরকারের সময়ে ফলাফল যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা লিবারেল থাকার নির্দেশনা থাকলেও এবার সেইরকম কোনো নির্দেশনা ছিল না। যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার ফলাফলের সূচকের ওপর। কাজেই যে ফলাফল জনসম্মুখে আসছে; সেটিই পড়ালেখার প্রকৃত চিত্র বলে আমরা মনে করছি।
প্রতিনিধি/এসএস




