মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

আশুগঞ্জে মেঘনা থেকে বালু উত্তোলন: হুমকির মুখে নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র

আশিকুর রহমান মিঠু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

আশুগঞ্জে মেঘনা থেকে বালু উত্তোলন: হুমকির মুখে নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনা নদী থেকে বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আকতার নামে স্থানীয় বিএনপির একটি প্রভাবশালী মহল। এতে ভয়াবহ নদীভাঙনসহ মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড লাইন, নৌবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ  স্থাপনা। অবিলম্বে বালু মহাল বন্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আশুগঞ্জ বন্দর এলাকা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী মেঘনা নদীতে দিন-রাত ড্রেজার বসিয়ে বেপরোয়া বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশ ও তীর একসঙ্গে ভেঙে পড়ছে, যা যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইতোমধ্যে চরসোনারামপুর গ্রাম ও পানিশ্বর গ্রামে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বালুর চাহিদার কথা বিবেচনা করে মহাসড়কের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিগো মীর আক্তারের প্রতিনিধি ‘এ টু বি করপোরেশন’কে তিন মাসের জন্য মেঘনা নদীর বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু তোলার অনুমতি দেয়  জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাল নিশান দিয়ে সীমানাও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়।

1000154162

কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারীরা প্রশাসনের দেওয়া লাল নিশান উঠিয়ে ফেলে বালু উত্তোলনের মহোৎসবে নেমে পড়ে। প্রতিদিন নিয়ম বহির্ভূতভাবে একসঙ্গে ১৫/২০টিরও বেশি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সরাসরি নদীর পাড়ে চলে আসা হচ্ছে। শুধু তাই নয় এসব বালু মহাসড়কে ব্যবহারের কথা বলা হলেও নদীতে ড্রেজার থেকেই প্রকাশ্যে বিভিন্ন নৌকায় বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে চরসোনারামপুর গ্রাম,  নৌ বন্দর এলাকাসহ, কৃষিজমি, বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চরসোনারামপুর গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার জনগণের বসবাস। গ্রামটি এখন হুমকির মুখে। চরসোনারামপুরের পাশে নদীর পাড় দাঁড়িয়ে আছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ২৩০ কেভি বিদ্যুতের রিভার ক্রসিং টাওয়ার। বালু তোলার কারণে টাওয়ারের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা চলতে থাকলে জাতীয় গ্রিড মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো বলছে, এভাবে বালু তোলা চলতে থাকলে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড ও বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড লাইন  ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

thumbnail_1000154160

তথ্যানুসন্ধ্যানে জানা যায়, বিগত ২০২২ সালে তৎকালীন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দ বিশ্বাস নদী জরিপ করে। এ বিষয়ে তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন- চরসোনারামপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন হলে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড, আশুগঞ্জ বন্দর এলাকা, তীরবর্তী বাড়ি-ঘর ও কৃষিজমি নদী ভাঙনের শিকার হবে। একই মত প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ও। এরপরও সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

আরও পড়ুন

সাদাপাথরে ১৫ লাখ ঘনফুট পাথর প্রতিস্থাপন, উদ্ধার প্রায় ২৮ লাখ ঘনফুট

আশুগঞ্জ জেনারেল মার্সেন্ট অ্যান্ড কমিশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম জারু বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে তীরবর্তী এলাকা তো বটেই, আশুগঞ্জ বন্দরও হুমকির মুখে পড়বে। আমরা ইজারা বাতিলের আবেদন করেছি, প্রয়োজনে আদালতের শরণাপন্ন হব।

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, মহাসড়কের ফোরলেন প্রকল্পের জন্য বালুর চাহিদা থাকায় তিন মাসের জন্য মীর আক্তারের প্রতিনিধিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সীমানা অতিক্রান্ত কিংবা চুক্তি ভঙ্গ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

1000154162

অন্যদিকে মীর আক্তারের প্রতিনিধি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল আহমেদ জয় দাবি করেন, তারা ইজারার শর্ত মেনেই বালু উত্তোলন করছেন। তবে ভৈরবের একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে, যার দায় অন্যায়ভাবে তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সরকারি দফতরের একাধিক প্রতিবেদনেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এ এলাকায় বালু তুললে ভয়াবহ ক্ষতি হবে। তারপরও অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন চালানো হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে আশুগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও হাজারও মানুষের বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর