মাইজদীতে অপরিকল্পিত সিএনজি স্ট্যান্ড, যানজটে ভোগান্তি 

হাবীব ইমন । এ এস এম নাসিম  নোয়াখালী থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২২, ০৯:৪৫ পিএম
মাইজদীতে অপরিকল্পিত সিএনজি স্ট্যান্ড, যানজটে ভোগান্তি 
ছবি : ঢাকা মেইল

মাইজদী শহর তখন নতুন করে তৈরি হয়েছে। শত বছরের ঐতিহ্যের মূল নোয়াখালী শহর মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে গেলে ব্রিটিশদের নকশা অনুযায়ী বর্তমান মাইজদীতে নতুন করে শহরের সৃষ্টি হয়। 

বলা হয় ‘এক রাস্তার শহর মাইজদী’। কিন্তু বর্তমানে শহরটিতে প্রবেশ করলে মনে হবে ঘিঞ্জি এলাকা। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পার্কিং স্ট্যান্ড। যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এতে শহরের বিভিন্ন স্থানে যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। এতে শহরের ছিমছাম সৌন্দর্যও অনেকটা ম্লান হয়ে আছে। 

দক্ষিণে সোনাপুর জিরো পয়েন্ট থেকে উত্তরে মাইজদী বাজার পর্যন্ত মাত্র ছয় কিলোমিটার সড়কে সিএনজি স্ট্যান্ড রয়েছে অন্তত ৮টি। চলছে চৌরাস্তা-সোনাপুর চার লেন প্রকল্পের কাজ। বৃষ্টির দিনে রাস্তাগুলো থাকে কর্দমাক্ত। হাঁটা বা দাঁড়ানোর কোনো জায়গাও নেই।  

noakhali কলেজ শিক্ষক আকলিমা আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, ভোগান্তির অপর নাম এখন নোয়াখালীর প্রধান সড়ক। গতকাল মঙ্গলবার সকালে চৌমুহনী থেকে মাইজদী পর্যন্ত আসতে তার সময় লেগেছে দেড় ঘণ্টা। এতে গাড়িতে থাকা নারী-শিশুরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাপুর জিরোপয়েন্ট থেকে মাইজদী বাজার পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এ পৌর শহর। ‘এক রাস্তা’র এ শহরে পৌর নাগরিক ছাড়াও পাশাপাশি দাফতরিক, স্বাস্থ্য ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার কারণে প্রতিদিনই লাখও মানুষের আনাগোনা থাকে। 

উপজেলাগুলো থেকে জেলা শহরে আসার জন্য যাত্রীবাহী বাস তেমন একটা না থাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। ফলে শহরের প্রধান ও সংযোগ সড়ক ঘিরে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ সিএনজি পার্কিং স্ট্যান্ড। এ সময় সড়কের উভয় পাশে দূরপাল্লারসহ বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট করে যানজটে আটকে থাকতে হয়। 

noakhali

সোনাপুর জিরোপয়েন্টের চারপাশে বৃহৎ পার্কিংয়ের পাশাপাশি পুরো পৌর শহর জুড়ে রয়েছে ৮টি সিএনজি স্ট্যান্ড। যার মধ্যে মসজিদ মোড় থেকে মাইজদী বাজার পর্যন্ত এ দেড় কিলোমিটারে প্রধান সড়ক ও তার পাশের সংযোগ সড়কে রয়েছে ৭টি। এতে একদিকে যেমন অসহনীয় যানজট ও মানবজট তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন, অন্য দিকে শহরের সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। আবার দোকানিরা বেগ পাচ্ছে পণ্য বিক্রিতে। এসব স্ট্যান্ডে বখাটেপনা, ছিনতাইসহ চালকদের বিরুদ্ধে রয়েছে অশোভন আচরণের অভিযোগও।

প্রতিদিন সিএনজি চালিত অটোরিকশাযোগে সোনাপুর থেকে মাইজদী এসে অফিস করেন দীন মোহাম্মদ। 

তার সঙ্গে কথা হলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা চাই সিএনজিগুলো নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে থাকুক। রাস্তার ওপরে কোনো স্ট্যান্ড থাকলে যানজটের তৈরি হয় এবং অফিসে আসতে যেতে বেশি সময় লাগে।

আফরোজা আক্তার নামে আরেকজন বলেন, মাইজদীতে সিএনজি-অটোরিকশার জন্য কোনো স্ট্যান্ড না থাকায় রাস্তায় যানজট সব সময় লেগে থাকে। আমরা এর পরিত্রাণ চাই। 

কথা বলছিলাম নোয়াখালী নাগরিক অধিকার মোর্চার যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, একটি পরিকল্পিত শহরের পরিকল্পনায় গলদ থাকলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অপরিকল্পিত শহরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। নোয়াখালী জেলা শহরের অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ডগুলো দ্রুত অপসারণ, তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

noakhali

এদিকে, মালিক সমিতির নেতারা শহরের সবগুলো সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডকে অবৈধ স্বীকার করে নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে সড়কে পার্কিং করছে বলে জানান।

জেলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান রাজু ঢাকা মেইলকে বলেন, নির্দিষ্ট স্থানে স্ট্যান্ড নির্মাণ করা হলে সবগুলো সিএনজি এক জায়গা থেকে যাত্রী নিতে পারতো। তাহলে আর রাস্তায় কোনো সিএনজি-অটোরিকশা থাকার সুযোগ থাকবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অটোরিকশার চালক জানান, ‘স্ট্যান্ড না থাকায় এ সড়কের দুই পাশে গাড়ি রাখা হয়। অন্যত্র গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই।’ একই ধরনের কথা বললেন আরও কয়েকজন চালক।

পৌরসভার হিসাবে দেখা যায়, শহরের সোনাপুর ও নতুন বাস স্ট্যান্ড এলাকায় দুটি টার্মিনাল রয়েছে। অথচ ওই দুইটি টার্মিনালে শুধু দূরপাল্লার বাসই থাকে। আর সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে সড়ক ঘিরে। 

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, বহুবার সরানো হলেও চালকরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফের অবৈধ পার্কিং করছে। তবে এবার কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে পৌর কর্তৃপক্ষ আর সম্মিলিত উদ্যোগের কথা জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।

তবে, পৌর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পৌরসভার পক্ষ থেকে কয়েকটি সিএনজি স্ট্যান্ড করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান পৌর মেয়র। 

‘সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়’ বলে মনে করেন ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. বখতিয়ার উদ্দীন। তিনি জানান, ট্রাফিক বিভাগ সবসময় যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে। শহরের প্রধান সড়কের অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো সরানোর জন্য বিভিন্ন সময় মাইকিং করা হয়েছে। যত্রতত্র গাড়ি না থামাতে ড্রাইভারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে, সিএনজি-অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড স্থাপনের প্রয়োজন।

ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ একযোগে কাজ করলে মাইজদী যানজট মুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিনিধি/এইচই