প্রতিবছর জুনের ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে হাাঁড়িভাঙা আম পাড়া শুরু হলেও এবার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গাছ থেকে আগাম আম পারা শুরু করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তবে কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে পরিপক্ব হওয়ায় রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে রংপুরের জিআই পণ্যখ্যাত ‘হাঁড়িভাঙা’ আমপাড়া।
রোববার (১৫ জুন) দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মিঠাপুকুর উপজেলা কুষি অফিসার মুহাম্মদ সাইফুল আবেদীন।
বিজ্ঞাপন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এবারে রংপুর জেলায় হাঁড়িভাঙা আম আবাদ করা জমির পরিমাণ ১ হাজার ৯১৫ হেক্টর। এর মধ্যে মিঠাপুকুরে ১ হাজার ২৬৮ হেক্টর। জেলায় সম্ভাব্য হাঁড়িভাঙা আমের উৎপাদন ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন। তন্মধ্যে মিঠাপুকুরে ২৬ হাজার মেট্রিক টন।

আমচাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গড়ে ৫০-৬০ টাকা কেজি ধরলেও হাঁড়িভাঙা আম বিক্রিকে কেন্দ্র করে রংপুরে এ মৌসুমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার লেনদেন ছাড়িয়ে যাবে। সেই সাথে কুরিয়ার সার্ভিস, সুতলি, ক্যারেট, পেপারসহ অন্যান্য লেনদেনে ৩০০ কোটি টাকার ব্যবস্থা হবে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, খুব সকাল থেকেই বাগানে বাগানে আম পাড়া শুরু করে হয়। বাগানকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বাড়ির সদস্যরই বিশেষ কোটা দিয়ে আম পাড়ে। পাড়া আমগুলো সাইজ বাছাই শেষে ক্যারেটে তোলে। যারা বাগান কিনেছে, তারা শ্রমিক লাগিয়ে আম পাড়তে শুরু করেছে। সবমিলিয়ে আম বাগানে বাগানে মানুষের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।

এদিকে হাঁড়িভাঙার জন্য বিখ্যাত হাট পদাগঞ্জ হাট নতুন আমে ভরে গেছে। এ মৌসুমের প্রথম দিনেই কানায় কানায় পরিপূর্ণ পদাগঞ্জ হাট। পদাগঞ্জের হাটে সকাল থেকেই অটোরিকশা, ভ্যান ও পিকআপে করে আসতে শুরু করেছে ক্যারেটে ক্যারেটে আম। অনেককেই হাটের সম্মুখ রাস্তায় সাইকেল ও ভ্যানে ক্যারেটে আম নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আম বেচতে দেখা গেছে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সরব উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে উঠেছে আমের বেচাকেনা। শুধু পদাগঞ্জ হাটেই নয়, মৌসুমের শুরুর দিনে হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান উৎপাদন এলাকা খোঁড়াগাছ, পাইকারহাট, ময়েনপুর, চ্যাংমারী, বালুয়া মাসুমপুর, কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, রামনাথপুর, কালুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এসব এলাকায় হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করার ধুম চলছে। হাটে-বাজারে মানুষের সমাগমই প্রমাণ করছে এসব এলাকা যেন হাঁড়িভাঙা আমের রাজ্য।
আরও পড়ুন

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাঁড়িভাঙা আম বাজারজাতের জন্য পদাগঞ্জ হাটের পাশে কয়েকটি গুদাম ঘর থেকে আম ট্রাকে লোড করতে দেখা যায়। লোড করা আমের ট্রাকগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাবে। হাঁড়িভাঙা আম কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে পূর্বে থেকেই ডজনখানেক কুরিয়ার সার্ভিস অফিস ভাড়া নিয়েছে। সেই অফিসগুলো থেকে আমের বুকিং নেওয়া হচ্ছে। দিনভর বুকিং শেষে রাতে ছেড়ে যাবে সেই সব কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ি। সবমিলিয়ে আমবাগানের মালিক, আমের ফড়িয়া, বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তি, মৌসুমি আম বিক্রেতা, অনলাইনে আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ী, সবাই যে যার মতো করে আম কেনাবেচার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন।

রংপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন গড়ে ওঠা আম বাজার, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার, শাপলা চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন হাট-বাজারে সকালেই চলে এসেছে হাঁড়িভাঙা আম।এছাড়াও হাট-বাজার ছাড়াও পাড়ামহল্লার অলিগলিতে ফেরি করে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বাজারে আমের আকার বা সাইজ ভেদে প্রতিমণ আম পাইকারিভাবে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। তবে আবহাওয়া সহনীয় থাকলে আমের বাজার কিছুটা বেশি হবে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাগান মালিক রবিউল ইসলাম জানান, এবার আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় আজ থেকে আম পাড়া শুরু হয়েছে। এখনও ভালোভাবে পাইকার ও ক্রেতা আসেনি। দুই একদিনের মধ্যে আম পাড়ার বিষয়টি জানাজানি হলে তারা আসবে। তাছাড়া মৌসুমের শুরুতে হওয়ার কারণে দাম এখনও বাড়েনি। দুই একদিনের মধ্যে দাম বাড়বে।
তবে চাষিরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম পাকলে এটি দুই তিন দিনের বেশি রাখা যায় না। সংরক্ষণের জন্য কোনো কার্যকর পদ্ধতিও জানা নেই। যদি এই আম সংরক্ষণের সঠিক প্রক্রিয়া জানা থাকত, তাহলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে প্রচুর পরিমাণে রফতানি করা সম্ভব হতো। কয়েকবছর ধরে হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণের জন্য এ অঞ্চলে একটি বিশেষায়িত হিমাগারের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।

অন্যদিকে হাড়িভাঙা আম দেশ বিদেশে সরবরাহের কারণে প্লাস্টিকের ক্যারেট, সুতলি, খাঁচা, পেপারসহ আনুষঙ্গিক জিনিসের চাহিদা বেড়েছে। গতবারের তুলনায় এবারের এসব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। গতবছর এসময় বাংলা ক্যারেট ১১০ টাকা হলেও এখনই ১২০ টাকা, ভালোমানের ক্যারেট গতবার ১২০-১৩০ টাকা হলেও এবার ১৩০-১৫০ টাকা। বেড়েছে সুতলী এবং পেপারের দামও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের রংপুরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম এখন জিআই পণ্য। এই হাঁড়িভাঙা আমের মাধ্যমে রংপুরের কৃষি অর্থনীতি চাঙা হয়েছে। এ বছর আমগাছে মুকুল কম এলেও আমের আকার ও ফলন ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে হাঁড়িভাঙা বাজারে আসলেও প্রকৃত সময় এবার ১৫ জুন। সেই মোতাবেক আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়া শুরু হয়েছে। দাম এখনও কম রয়েছে। তবে দুই একদিনের মধ্যে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস




