সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বিপন্নের পথে কক্সবাজার সৈকতের সাগরলতা

তাহজীবুল আনাম
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২২, ১০:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

বিপন্নের পথে কক্সবাজার সৈকতের সাগরলতা

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অমূল্য সম্পদ বালিয়াড়ি রক্ষাকারী সাগরলতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সৈকত তীরে দখল- দূষণে বিপন্ন হতে যাচ্ছে উপকূলের রক্ষাকবচ সাগরলতা।

সাগরলতাকে বালিয়াড়ির রক্ষাকবচ বলার কারণ হলো— সমুদ্র সৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ এবং শুকনো উড়ন্ত বালুরাশিকে আটকে বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি তৈরির কাজ করে সাগরলতা। কিন্তু পর্যটন শিল্পের কারণে দখল ও দূষণের শিকার হয়ে গত প্রায় ৩ দশকে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতের বড় বড় বালিয়াড়িগুলো প্রায়ই হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সমুদ্র তীর ভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার একর ভূমি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।


বিজ্ঞাপন


১০ বছর আগেও কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতজুড়ে গোলাপী-অতিবেগুণী রঙের ফুলেভরা সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্যময় পরিবেশ ছিল। সেই পরিবেশের কথা ভেবে শহরের অনেক বাসিন্দা ও পর্যটক এখন কেবলই আক্ষেপ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ ও সংকটাপন্ন পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজে লাগানো হয় সাগরলতাকে। উন্নত বিশ্বের গবেষণালব্দ ফলাফল অনুযায়ী সাগরলতা সৈকত অঞ্চলে পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও মাটির ক্ষয় রোধের জন্য একটি ভাল প্রজাতি বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাগরলতা ন্যূনতম পুষ্টিসমৃদ্ধ বেলে মাটিতে বেড়ে ওঠতে পারে। এর পানির প্রয়োজনীয়তাও কম হয়। উচ্চ লবণাক্ত মাটিও তার জন্য সহনশীল। এর শিকড় মাটির ৩ ফুটের বেশি গভীরে যেতে পারে। এটি দ্রুতবর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ না হলে লতাটি চারিদিকে বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ সামুদ্রিক জোয়ারের উপরের স্তরের বালিয়াড়িতে জাল বিস্তার করে মাটিকে আটকে রাখে। এরপর বায়ু প্রবাহের সঙ্গে আসা বালি ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে মাটির উচ্চতা বৃদ্ধি করে। এতে সাগরলতার ও সৈকতের মাটির স্থিতিশীলতা তৈরি হয়।

কক্সবাজারের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম জানান, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতোই বড় বড় বালির ঢিবি ছিল। এসব বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। সাগরলতার গোলাপী-অতিবেগুণী রঙের ফুলে সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্য তৈরি হত। কিন্তু সাগরলতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত প্রায় ৩ দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫শ মিটারের বেশি ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম মোহাম্মদ তারেক জানান, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে গত প্রায় ২ দশক আগেও বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি দেখা যেত। আর এসব বালিয়াড়িকে ঘিরে সাগরলতাসহ নানা লতা-গুল্ম ও উদ্ভিদরাজি গড়ে উঠত এবং এসব উদ্ভিদরাজিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠত স্বতন্ত্র প্রাণবৈচিত্র্যও। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দখল দূষণের কারণে সমুদ্র তীরের বালিয়াড়িগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে সাগরলতাও এখন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, বালিয়াড়িকে কক্সবাজার অঞ্চলে ডেইল নামে অভিহিত করা হয়। কক্সবাজার উপকূলের কুতুবদিয়া থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত এই ধরনের বহু বালিয়াড়ি দেখা যেত। সমুদ্র তীরের বাসিন্দারা এই ধরনের বালিয়াড়ি ঘিরেই লোকালয় তৈরি করে। আর এ লোকালয়গুলো ‘ডেইলপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়। যেমন কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল, উখিয়া জালিয়াপালং এর ডেইল পাড়া, টেকনাফের মুন্ডার ডেইল ও সেন্টমার্টিনের ডেইলপাড়া অন্যতম। কক্সবাজার জেলায় এই ধরনের আরো বহু ডেইলকেন্দ্রিক লোকালয় রয়েছে। একসময় কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও অন্তত ৫শ ফুট চওড়া একটি ডেইল ছিল। এই ডেইলের কোন কোন স্থানে উচ্চতা ৩০ ফুটেরও বেশি ছিল। যেখানে থরে থরে ফোটা সাগরলতার ফুল দেখা যেত। আর তা দেখে চোখ জুড়াত পর্যটকদের। কিন্তু এসব বালিয়াড়িকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সরকারি- বেসরকারি নানা স্থাপনা। ফলে এখন আর শহরের কোথাও তেমন একটা সাগরলতা দেখা যায় না। তবে শহরের বাইরে যেখানে কিছু বালিয়াড়ি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, সেখানে  সৌন্দর্য্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছে সাগরলতা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান, কক্সবাজার সৈকতের সৌন্দর্যমানকে সুসজ্জিত করতে হলেও সাগরলতার দরকার। সমুদ্র সৈকত না থাকলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প টিকতে পারবে না। তাই পর্যটনের স্বার্থেও বালিয়াড়ি ও বালিয়াড়ি উদ্ভিদ রক্ষার মাধ্যমে কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দরকার।তাই সাগরলতা ও পরিবেশ রক্ষায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন, সৈকতের তীর দখল- দূষণ থেকে সরে আসতে হবে।

বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সৈকতের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে আমরা সাগরলতার বনায়ন ও তা সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আশা করছি খুব দ্রুতই এর একটি ফলাফল পাওয়া যাবে। আমাদের সাগরলতা ও বালিয়াড়ি সংরক্ষণ করতে হবে।

টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর