সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম মাদারপুর ও জয়পুর। গ্রাম দুইটি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের অন্তর্গত।
মাদারপুর গ্রামের বাসিন্দা নীলমনি সরেন। বয়স ৫২। তার স্বামী নুইশ টুডু দিনমজুর। তাদের তিন ছেলের মধ্যে দুজন পড়ালেখা করছে। স্বামী-স্ত্রী দুইজনই দিনমজুরের কাজ করেন। গতবছর তিনবিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন তারা। এতে উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। মোট ৫৩ মণ ধান পেয়েছেন।
নীলমনি সরেন বলেন, ‘দিনমজুরের কাজ করে সংসার চলছে। ঘরের চালের ভাত খাচ্ছি। দিনমজুরের আয় দিয়ে বাজার খরচ ও ছেলেদের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছি। আমাদের ঘরে অভাব নেই। আমরা এখন ভালো আছি।’
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর। এইদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকলের আওতাধীন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমিতে শ্রমিক-কর্মচারি ও পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ নামের তিন সাঁওতাল নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত ও গুলিবিদ্ধ হন। ওইদিন সাঁওতালদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। সাঁওতালদের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধান-চাল লুট হয়ে যায়। এই ঘটনার পর সাঁওতালদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
মাদারপুরের পাশ্ববর্তী জয়পুর গ্রামের বৃদ্ধা সোনামনি টুডু। বয়স তার ৬২। তিনি নিঃসন্তান। স্বামী আন্দ্রীয় হেমব্রম বার বছর আগে মারা গেছেন। সহায়-সম্পদ বলতে কিছুই নেই। একচালা ছাপড়া ঘরে থাকেন। বিধবা ও বয়স্ক ভাতা কোনোটাই পাননি। কিন্তু তাতেও নিরাশ হননি তিনি। বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরি করেন। তাতে করে কোনোমত দিন চলে যায় তার।
সোনামনি টুডু বলেন, ‘একটি খাঁচা তৈরিতে ৩০ টাকা খরচ পড়ে। দৈনিক সাত থেকে আটটি খাঁচা তৈরি করা যায়। প্রতিটি খাঁচা ৫০-৬০ টাকা বিক্রি করি। প্রতিমাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় করছি। একার সংসার ভালই চলছে।’
নীলমনি সরেন ও সোনামনি টুডুর মত মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষের ঘরে এখন আর অভাব নেই। বিগত ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকলের আওতাধীন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি থেকে উচ্ছেদের ঘটনার পর গত পাঁচ বছরে তারা পরিশ্রম করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কেউ অলসতা করে বসে থাকেননি। কেউ দিনমজুরি, কেউ রিকশা-ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করে, কেউ শ্রমিকের কাজ করে, কেউবা অন্য জেলায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। অভাব আর তাদের দুয়ারে হানা দিতে পারে না।
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর। এইদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকলের আওতাধীন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমিতে শ্রমিক-কর্মচারি ও পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ নামের তিন সাঁওতাল নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত ও গুলিবিদ্ধ হন। ওইদিন সাঁওতালদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। সাঁওতালদের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধান-চাল লুট হয়ে যায়। এই ঘটনার পর সাঁওতালদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেসময় কিছুদিন সরকারি-বেসরকারি সাহায্য পেলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন তারা সংকটের মধ্যে দিন কাটান। এরই মধ্যে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সাঁওতালরা কারোর মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেরা পরিশ্রম করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ সাঁওতাল ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অবশ্য এখনো অনেকের মধ্যে অভাব রয়েছে।
এদিকে ওইদিনের ঘটনায় নিহত তিনজন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল, রমেশের নামে জয়পুর গ্রামে গড়ে উঠেছে শ্যামল, মঙ্গল, রমেশ স্মৃতি বিদ্যানিকেতন।
‘সাঁওতালদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বিনা বেতনে পাঠদান করছি। তারপরও হতাশ নই। কারণ গতবছর ছয় বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। প্রায় ১১০ মণ ধান পেয়েছি। এখন আর অভাব নেই।’
নিকেতনের প্রধান শিক্ষক প্রিসিলা মুরমু বলেন, ‘সাঁওতালদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বিনা বেতনে পাঠদান করছি। তারপরও হতাশ নই। কারণ গতবছর ছয় বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। প্রায় ১১০ মণ ধান পেয়েছি। এখন আর অভাব নেই।’
মাদারপুর গ্রামের রুপামনি টুডু বলেন, ‘প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তিন সদস্যের সংসার। এবার তিনবিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। ঘরের ধানের ভাত খাবো। আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে বাজার খরচ চালাবো। আমাদের অভাব নেই। আমরা ভালো আছি।’
তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে কাঁথা সেলাই করি। কাঁথা সেলাই করেও কিছু আয় করছি।’
সাঁওতাল নেতা ও সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ‘আমাদের লোকজন রোদের মধ্যে পরিশ্রম করে। তাই অনেকেরই ভাগ্য খুলেছে। তারা আবারও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আর যারা এখনো অর্থকষ্টে বা কর্মহীনতায় ভুগছেন তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’
এইচই/এএ




