অযত্নে নষ্ট হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বিমানবন্দরটি

চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২২, ০৯:৪১ পিএম
অযত্নে নষ্ট হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বিমানবন্দরটি
অযত্নে নষ্ট হচ্ছে হাটহাজারীর বিমানবন্দরটি। ছবি: ঢাকা মেইল

অনেকেরই জানা নেই চট্টগ্রামের হাটহাজারী বিমানবন্দরের কথা। জানার কথাও নয়। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী জাপানকে কাবু করতে হাটহাজারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে ৩৭ একর জায়গাজুড়ে বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে বিমানবন্দরটি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে সেখানকার নির্মিত দৃষ্টিনন্দন প্রশাসনিক ভবন, সিগন্যাল ওয়ারসহ নানা স্থাপনা অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে থাকে। এমনকি অধিগ্রহণকৃত জমিও ক্রমেই বেহাত হতে থাকে।

হাটহাজারী উপজেলা সদর ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসহাক সওদাগর (৭২) জানান, বর্তমানে বিমানবন্দরের রানওয়ের জন্য নির্মিত সড়কের কিছু অংশ দৃশ্যমান থাকলেও প্রশাসনিক ভবন ও সিগন্যাল ওয়ারের ঘরটি আগাছায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। দেওয়ালে শেওলা জমে গেছে, খসে গেছে পলেস্তারা। এমনকি দেওয়ালের অনেক স্থানের ইট খসে পড়ে গেছে।

তাছাড়া বিশাল জায়গা নিয়ে ১৯৯৫ সালে ওই এলাকায় জেলা দুগ্ধ খামার এবং ২০০৬ সালে জেলা ছাগল খামার প্রতিষ্ঠা করা হয়। দুগ্ধ ও ছাগল খামারের পাশে গুচ্ছ গ্রাম, আদর্শ গ্রাম, আশ্রয়ন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রানওয়ের পাশে দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা শ্মশান, কালিবাড়ি ও পূজা মণ্ডপ।

তাছাড়া এখানে কৃষি ইনস্টিটিউট, হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। সম্প্রতি জেলা দুগ্ধ খামার এর পাশে চট্টগ্রামের ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম বেইস ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। পরিত্যক্ত জায়গা উদ্ধার করে এখানে পর্যটন কেন্দ্র করা হলে প্রতি বছর সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হতে পারে। এমন মত স্থানীয়দের।

তবে এই বিমানবন্দর যে চট্টগ্রামের ইকোনমকি হাবের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে তা কারও চিন্তায় আসেনি। বিষয়টি ঠিকই অনুধাবন করেছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সন্তান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চট্টগ্রাম চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলছিলেন, চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুন্ড ও ফেনী নিয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হচ্ছে। চায়না ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড, বে-টার্মিনাল, কর্ণফুলি টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, এলএনজি টার্মিনালসহ মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে ইকোনমিক হাব হবে চট্টগ্রাম।

সে হিসেবে পাঁচ বছর পর ২-৩ লাখ বিদেশি চট্টগ্রামে থাকবে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশের ১৭ শতাংশ যাত্রী ওঠানামা করে। তাই এ বিমানবন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি হাটহাজারীতে আরেকটি বিমানবন্দর করা যেতে পারে। ব্রিটিশ আমলে হাটহাজারীতে একটি বিমানবন্দর ছিল। এটিকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যায়ে উন্নীত করা গেলে আকাশপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মাইলফলক হবে।

তথ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে আরও বলেন, একসময় কলকাতা ছিল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এরপর ছিল চট্টগ্রাম। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে করে মানুষ বোম্বে-করাচি হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অনেক বিদেশযাত্রা জাহাজে হয়েছিল। এরপরই বিমানের যাত্রা শুরু হয়। ষাটের দশকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সমৃদ্ধি একসাথে শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম পিছিয়ে যেতে থাকে।

তবে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স একটি অন্যন্য সাধারণ কাজ করেছে। বোম্বের পরে ভারতীয় উপমহাদেশে চট্টগ্রাম ছাড়া আর কোথাও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নেই। এটি সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায়। তিনি ১৯৯৬ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবার পর চট্টগ্রাম চেম্বারকে এই জায়গাটি দিয়েছিলেন। চেম্বারের মেলার জন্য স্থায়ী ভেন্যু চায়। রেল, বন্দর, সিডিএ কোন সংস্থার কাছে জায়গা আছে তা খুঁজে দেখেন। সবাই উদ্যোগ নিলে তারপর সেটির সংস্থান হয়ে যাবে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৩ টনের ওজন স্কেলের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কস্ট অব ডুয়িং বেড়ে গেছে। ১৩ টন হলে সারাদেশের জন্য হওয়া উচিত। সব কিছু ঢাকা কেন্দ্রিক করা উচিত নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা থেকে কৃষি পণ্যের ইমপোর্ট পারমিট ইস্যুর উদ্যোগ নেয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন এরিয়ার সৃষ্টি হলেও এরপর আর আয়তন বাড়েনি। তখন চট্টগ্রাম শহরের লোক সংখ্যা ছিল ১০-১২ লাখ। বর্তমানে সেটা ৭০ লাখে পৌঁছেছে। ভাটিয়ারি, মদুনাঘাট, কালুরঘাট সেতুর অপর প্রান্তসহ অনেক জায়গা মেট্রোপলিটন এরিয়ার বাইরে। তাই মেট্টেপলিটন এরিয়া বাড়ানোর পাশাপাশি সিটি করপোরেশন এরিয়া বাড়ানো প্রয়োজন। আর এসব কিছুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে হাটহাজারী বিমানবন্দর।

আইকে/জেবি