প্রকৃতিতে এখন বসন্ত এলেও রয়ে গেছে শীতের অসলতা জাগানো আমেজ। মিস্টি রোদ আর বাতাসের তালে তালে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে মাটিতে।
ঋতুরাজ বসন্তের এই সময়ে উত্তরাঞ্চলের সমতলের চায়ের অঞ্চলে চা বাগানে প্রুনিং (ছাঁটাই বা কলমের) কাজ চলার পরে বাগানে বাগানে উঁকি দিচ্ছে নতুন কুঁড়ি। তবে এই শীতের আমেজও দ্রুত কুঁড়ি ছাড়ছে চা গাছ প্রুনিং করা ডালে উঁকি দিয়েছে নতুন কুঁড়ি।
বিজ্ঞাপন
সিলেট অঞ্চলের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পঞ্চগড় পেয়েছে। এ জেলাকে অনুকরণ করে চা চাষে এগিয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর,নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলা।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার যে সকল সমতল পতিত জমি এখন চায়ের রয়েছে। বর্তমানে ওই বাগানের সেকশন তালিকাভুক্ত করা চা গাছগুলোর মাথা ছেঁটে (প্রুনিং) করা হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টির বৃষ্টি পরশ না পাওয়ায় গাছগুলোতে দেরিতে নতুন করে উঁকি দিচ্ছে দুটি পাতা একটি কু্ঁড়ি।
এর আগে, এগুলোই চা-গাছদের সাহায্য করেছে কুঁড়িগুলোর প্রকৃতির মাঝে দ্রুত বের করে আনতে। এরই সাথে রয়েছে চা বাগানের হিসাব অনুযায়ী গড় উৎপাদন বাড়ার লক্ষ্যে প্রতি বছরে একবার করে চা-গাছে প্রুনিং করা হয়। চা-বাগানে একে বলে ছাঁটাই করা।
সেটা শুরু হয় জানুয়ারির পর থেকে। একেক বাগানে এই প্রুনিং এর তারিখ একেক সময় অর্থাৎ কিছু আগে-পিছে হয়ে থাকে।
বিজ্ঞাপন
প্রতি বছর যেসব সেকশনে (চা বাগানের সুনির্দিষ্ট এলাকা) প্রুনিং হয়ে থাকে তা নয়। পর্যায়ক্রমে গড়ে দুই-তিন বছর পর পর চলে প্রতি সেকশনে এই ছাঁটাইকরণ কার্যক্রম। তখন চা বাগানকে দেখা যায় অন্যরকম বিচিত্রভাবে। সবুজ সতেজ পাতাগুলো বিলীন হয়ে তখন ফুটে ওঠে শুধু ডালের উপস্থিতি। একেকটি চা-গাছে থাকে শক্ত শক্ত স্থুল-সরু ডাল। ডালের ওই কেটে ফেলা অংশটি থাকে ঠিক ওপরের দিকে। তারপর সময় গড়ায়। চা-বাগান থেকে ধীরে ধীরে শীত বিদায় নেন। চলে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। তবে শীতের আমেজ পুরোপুরি উধাও হয়ে যায় না। সকালে এবং সন্ধ্যের আধারে নামে শীতের উপস্থিতি। এর মাঝেই প্রুনিং করা চা-গাছেরা প্রহর গুণতে থাকে বৃষ্টির।
এদিকে,চা গাছের বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যতা এবং অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিবছর বাগানে বাগানে প্রুনিং কার্যক্রম চলে আসছে। বছরের শেষ দুই মাস ও বছরের শুরুর দুই মাস প্রুনিং কার্যক্রম চলায় সেসময় চা কারখানা বন্ধ থাকে।ইতোমধ্যে চা বাগানে প্রুনিং শেষ হয়ে গেছে। এখন চলছে গাছের গোড়া পরিষ্কার, মাটি নিংড়ানো, জংলি লতাগুল্ম পরিষ্কার ও পানি দেওয়ার কাজ করছে চাষীরা। নতুন পাতা চলে আসায় কয়েক সপ্তাহ পরে আবারও চালু হবে কারখানাগুলো। তবে উৎপাদন ভালো হওয়ার আশা করলেও দাম নিয়ে এবারও শঙ্কায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন চা চাষীরা।
অভিজ্ঞ টি-প্ল্যান্টার এবং চা বাগানের ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন,বাগানের চা গাছগুলোতে প্রুনিং শেষে নতুন কুঁড়ি গজায়। প্রুনিংয়ের পর চা বাগানগুলোতে চা গাছের গোড়া সাফা করানো, চা গাছের মাঝে বেড়ে উঠে লতাগুলোকে উপড়ে ফেলে দেয়া প্রভৃতি কাজ চলে। পরবর্তীতে চা গাছে আসে নতুন পাতা।
বর্তমানে চা গাছে প্রুনিং করার পর গাছের গোড়ার মধ্যে উলু পোকার (উঁই পোকা) বাসা থাকে। চা গাছের জন্য উলু পোকা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই উলু চা গাছের গোড়া বা শরীরের অংশ খেয়ে ফেলে। তখন চা গাছগুলো মরে যায়। তাই প্রুনিং এর পর আমরা সমতল জায়গায় তা পরিস্কার করে থাকেন বলে জানান উপজেলার মাঝিপাড়া এলাকার চা চাষী আমিরুল ইসলাম।
তিনি আরো বলেন, কিছুদিন আগে আগাছা পরিষ্কারের পাশাপাশি চা গাছে কিছু পরগাছা উদ্ভিদ জন্ম নিয়েছিল। তখন ওগুলোকে আমরা পরিষ্কার করি। তারপর শুষ্ক মৌসুমে যাতে করে আগুন না লাগে তার জন্য আমরা পরিষ্কার করে রাখি। এগুলো আমরা করি সব ম্যাচিউরড টি-তে (প্রাপ্তবয়স্ক চা গাছে)।
উপজেলা সদরের মমিনপাড়ার চা চাষী নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন,ইয়াং-টিতে (বাচ্চা চারা) এই সময় মাটি আচ্ছাদন করে কচুরিপানা দিয়ে মাটি ঢেকে দেয়া হয় যাতে করে মাটির পানি বাষ্প না হয়ে যায়। এটাকে চায়ের ভাষায় বলে ‘মার্চিং। এ ছাড়া চা বাগানের ক্লোন নার্সারিতে চলে মাটি দিয়ে প্লাস্টিক ব্যাগ ভরার কাজ। তাছাড়া এখন বৃষ্টি না হওয়ায় সেলো মেশিন দিয়ে চা গাছে পানি দিয়ে থাকি।
কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার কবীর আকন্দ জানান,এই সময়টাতে প্রুপিং-এর পর চা বাগানে বৃষ্টিপাত অনেকটা আশীর্বাদ হয়ে আসে। বৃষ্টির পরশ পেলেই সেই কাটা অংশ থেকে নতুন চারা গজাতে শুরু করে। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় এবার দেরিতে করে চা সবুজ নতুন পাতা এসেছে।

পঞ্চগড়ের বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, ‘সমতল ভূমিতে চা চাষের জন্য পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সদ্য সমাপ্তকৃত (২০২৩) মৌসুমে ১২ হাজার ১৩২ দশমিক ১৮ একর সমতল জমির ৩০টি চা বাগান এবং ৮ হাজারেরও অধিক ক্ষুদ্রায়তনের বাগান থেকে চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৩০ কেজি। যা বিগত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ২২৬ কেজি বেশি। এই উৎপাদনে টানা তিনবারের মতো উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে এ অঞ্চল বলে জানিয়েছে চা বোর্ড।
প্রতিনিধি/একেবি




