বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

রামেবির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: উত্তর জনপদে নবদিগন্তের উন্মোচন

আমানুল্লাহ আমান, রাজশাহী
প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৫৫ এএম

শেয়ার করুন:

রামেবির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: উত্তর জনপদে নবদিগন্তের উন্মোচন

উত্তর জনপদে নবদিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এ দুয়ার উন্মোচন হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এ ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১২ মে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এরপর ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মাসুম হাবিবকে রামেবির প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল যোগদানের পর ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৪ বছর তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করলেও রামেবির স্থায়ী রূপ দিতে পারেননি তিনি।

তার মৃত্যুর পর ২০২১ সালের ২৭ মে রামেবি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এজেডএম মোস্তাক হোসেন। করোনাকালে নিয়োগের পর স্বল্প জনবলেই কাজ শুরু করেন তিনি। নজর দেন রামেবির জায়গা চূড়ান্তকরণের দিকে। যোগদানের বছর খানেকের মধ্যেই ডিপিপি প্রণয়ন করে জমা দেন পরিকল্পনা কমিশনে। ডিপিপি প্রণয়নের পর গত বছরের ১৪ জুন রামেবি স্থাপন প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। প্রায় ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর বড়বনগ্রাম বারপাড়া ও বাজে সিলিন্দা মৌজার প্রায় ৬৮ একর জায়গার ওপর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) একনেক সভায় অনুমোদন পেয়েছে রামেবির ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প।

thumbnail_রামেবি১

সূত্র বলছে, রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে ১ হাজার ২০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। ১১টি চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ৬৯টি বিভাগে ৭৮০জন শিক্ষার্থী পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জনের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন প্রতিবছর। এছাড়া চিকিৎসা সেবার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম চলবে। প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতাল, নন-ক্লিনিক্যাল ফ্যাকাল্টি ভবন, ডরমেটরি ভবন, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য ভবন, সিনেট হল, স্কুল ও ডে-কেয়ার সেন্টার, ডাক্তার ও নার্সিং হোস্টেল, মসজিদ, মর্গ বভন. এন্ট্রি-এক্সিট গেট ও সীমানা প্রাচীরসহ গুরুত্বপূর্ণ ২০টি স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।


বিজ্ঞাপন


তথ্য বলছে, করোনার প্রভাবে সৃষ্ট শিক্ষার্থীদের সেশনজট কমাতে ‘বিশেষ রোডম্যাপ’ হাতে নেয় রামেবি। এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিএসসি-ইন-নার্সিং কোর্সের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থীদের এ ফলাফল প্রকাশ করে রীতিমতো চমক দেখায় প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭-১৮ সেশনের ওই শিক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করে শেষ হয় গত ৩ জানুয়ারি। এরপর ১৩ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে থিসিস ও প্রেজেন্টেশন পরীক্ষা গ্রহণের পর তৎক্ষণাৎ নম্বর বসানোর কাজ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর। এছাড়া পূর্বে সম্পন্ন হওয়া লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর নিয়ে রাতেই তৈরি করা হয় ফলাফল। রীতিমতো সবাইকে চমকে দিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় তা প্রকাশ করা হয়। যা দেশের স্বীকৃত কোনো বোর্ড পরীক্ষায় সবচেয়ে দ্রততম সময়ে ফলাফল প্রকাশ।

সূত্র জানায়, রামেবির অধীনে সরকারি ও বেসরকারি মোট ৭৩টি কলেজে এমবিবিএস, বিডিএস, বিএসসি ইন নার্সিং (বেসিক ও পোস্ট বেসিক), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব ও ফিজিওথেরাপিস্ট) এবং ইউনানী হামদর্দ কোর্স চালু রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১৩টি করে ২৬টি। নার্সিং কলেজ সংখ্যা ৪৪। এরমধ্যে ৬টি সরকারি কলেজ। ইউনানী হামদর্দ কলেজ একটি ও আইএইচটি রয়েছে দুটি। ২০১৭-১৮ সেশন থেকে কোর্সগুলো রামেবি অভিভূক্ত হয়। এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসব কোর্স করার সুযোগ ছিল। রামেবির অধীনে এমবিবিএস কোর্সে অধ্যায়নরত রয়েছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী। ২৬ টি মেডিকেল কলেজের শুধুমাত্র ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী রয়েছেন ২ হাজার ৫৪৫ জন। আর বিএসসি ইন নার্সিং বেসিক ও পোস্ট বেসিক কোর্সের ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ এ তিন সেশনের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩ হাজার ৩১৩।

সূত্র জানিয়েছে, রামেবিতে নিয়োগ হবে অন্তত ৪ হাজার জনবল। এতে অনেকাংশে কমবে উত্তরাঞ্চলের বেকারত্ব। প্রতিষ্ঠানটির আওতাভুক্ত সাড়ে ১১ হাজার শিক্ষার্থীর লেখাপড়া স্বাভাবিক রাখতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে। রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল কাদের। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান ছিলেন। আর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়  অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হাবিবকে। তিনি একটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া কলেজ পরিদর্শক পদে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্ত সঞ্চালন বিভাগের প্রধান। অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তাদের নিয়োগের পর দ্যূতি ছড়ায় রামেবি। অর্জন করে দেশসেরার খ্যাতি।

তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়েবমেট্রিক্স র‌্যাংকিংয়ে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দেশসেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে রামেবি। র‌্যাংকিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হয় ৭০তম। বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং তৈরিতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিখন পদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রভাব, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা, সাম্প্রদায়িক সন্নিবেশ অর্থাৎ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ভূমিকা বিবেচনা করে ওয়েবমেট্রিক্স। এক্ষেত্রে ওয়েবসাইটের কন্টেন্ট ৫০ শতাংশ, টপ সাই টেড গবেষকদের ১০ শতাংশ এবং টপ সাই টেড প্রবন্ধ ৪০ শতাংশ বিবেচনায় নিয়ে র‌্যাংকিং তৈরি করে ওই শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। ওই র‌্যাংকিংয়ে ১৫১তম অবস্থানে জায়গা পায় চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। আর সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান হয় আরও দূরে, ১৫৫তম।

এদিকে, চিকিৎসক ও নার্সদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের জন্য গত বছরের ২৩ নভেম্বর নেদারল্যান্ডের ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধিদল রামেবিতে এসে চুক্তি স্বাক্ষর করে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও নার্সদের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, স্নাতোকত্তর কোর্সসমূহের পড়ালেখা ও থাকার সুযোগ সৃষ্টি, টেকনোলজিতে দক্ষ এবং মানবসম্পদ বিনিময় ব্যবস্থা করার মতো এজেন্ডা রয়েছে চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী, ওই মাসেই সিরাজগঞ্জে ১৬ জন নার্সকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদল। আগামীতে স্কলারশিপ নিয়ে নেদারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন এখানকার নার্স ও চিকিৎসকরা।

thumbnail_HPM_&_Raj

নতুন দুয়ার উন্মোচনে রামেবি সংশ্লিষ্ট সকলে দারুণ উচ্ছ্বসিত। এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. নওশাদ আলী বলেন, আমি খুবই খুশি এবং অত্যন্ত আনন্দিত। দীর্ঘদিনের কাক্ষিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত কাজ শুরু হবে। এখানে একটি হাসপাতালও হবে। এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের সেবার কেন্দ্র হবে। এজন্য আমি খুবই আনন্দিত।

রামেবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হাবিব বলেন, আজ আমাদের সবার জন্য একটা আনন্দের দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রার প্রথম ধাপ শুরু হলো। উচ্চ শিক্ষার জন্য পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন চালু হবে এবং স্পেশালাইজড চিকিৎসার জন্য এখানে ১২০০ বেডের হাসপাতাল হবে। স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটা দ্বার উন্মোচন হলো। এর মাধ্যমে নবদিগন্তের উন্মেচন হলো। এখন আশা করা যায়, এটা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আলোর মুখ দেখবে।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম মোস্তাক হোসেন বলেন, বিশেষভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ইচ্ছা না থাকলে এগুলা হত না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সচিব, মুখ্য সচিব, প্রাইম মিনিস্টারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আব্দুল্লাহ স্যার- উনারা যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রী মহোদয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ এবং আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

রামেবি উপাচার্য বলেন, এখন ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হলো। ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনা নির্মাণের যে ছোটখাটো একটা বাধা ছিল, সেটা দূর হলো। আশা করি, অতি শীঘ্রই আমরা অবকাঠামো উন্নয়নে হাত দিতে পারব। নির্বাচনের আগেই এটা দেওয়া যায় কিনা, সেই চেষ্টায় আছি।

টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর