মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বিমানের কাছে বেবিচকের পাওনা ৫৮৪২ কোটি টাকা, লাভের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বেবিচকের পাওনা ৫৮৪২ কোটি টাকা, বিমানের লাভের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
বেড়েই চলেছে বিমানের ঋণের বোঝা। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা ছাড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। বছরের পর বছর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধ না হওয়ায় মূল পাওনার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিপুল সারচার্জ। অথচ একই সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কোটি কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখাচ্ছে। ফলে একদিকে বেবিচকের বকেয়া পাহাড়সম হচ্ছে, অন্যদিকে বিমানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও মুনাফার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বেবিচকের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বকেয়া এবং সারচার্জ মিলিয়ে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা।

বেবিচক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া জমতে থাকায় সংস্থাটির ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। সরকার ও বিমানের প্রশাসনে পরিবর্তন এলেও বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও পুরো অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি।

বেবিচকের অধীনে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিকসহ মোট আটটি বিমানবন্দর রয়েছে। এসব বিমানবন্দরে বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ হিসেবে ল্যান্ডিং, রুট নেভিগেশন সার্ভিস, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার ও এমবারকেশন চার্জ নেওয়া হয়। অন্যদিকে নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের মধ্যে রয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, চেক-ইন কাউন্টার ভাড়া, কার পার্কিং ও এভিয়েশন ক্যাটারিং সার্ভিস।

বিমানের বকেয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের, ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ১ হাজার ৭৮১ কোটি, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬০৩ কোটি, যশোর বিমানবন্দরে ১০ কোটি, সৈয়দপুরে ৩৬ লাখ, রাজশাহীতে ১ কোটি ৯০ লাখ, কক্সবাজারে ২ কোটি ২৬ লাখ এবং বরিশাল বিমানবন্দরে ৩১ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

বিমানের এই মোট বকেয়ার মধ্যে ৫১২ কোটি টাকা ভ্যাট এবং ৫৩ লাখ টাকা আয়করও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় রাজস্ব আদায়েও এর প্রভাব পড়ছে।

বেবিচকের কাছে বিমানের ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার বকেয়া কতটা বড়, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকার রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং ২ হাজার ১৬ কোটি টাকার আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প—দুইটির মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিমানের কাছে আটকে থাকা অর্থ দিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ওই দুটি বড় প্রকল্পের প্রায় পুরো ব্যয়ই মেটানো সম্ভব ছিল।

এমনকি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ব্যয় হওয়া অর্থের তুলনায় এই বকেয়া প্রায় তিন গুণ। আর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ২৭ শতাংশও বিমানের কাছে বকেয়া এই অর্থ দিয়ে মেটানো সম্ভব।

বিপুল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ফ্লাইট পরিচালনা করতে দিচ্ছে বেবিচক। তবে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে বকেয়া পরিশোধ না করলে ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধ আরোপের নজির রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের ক্ষেত্রে বেবিচকের নীতির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

কাটছে না বিমানের শনির দশা!

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যুক্ত হচ্ছে ১৪টি নতুন বোয়িং

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি এয়ারলাইন্সের প্রতি বেবিচক দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। সারচার্জের চাপে দেশের কয়েকটি এয়ারলাইন্স বন্ধও হয়েছে।

তার মতে, পুরনো বকেয়া নিয়ে বেবিচক ও এয়ারলাইন্সগুলোকে একসঙ্গে বসে মূল পাওনা ও সারচার্জ সমন্বয়ের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে বিমানকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সময় দিয়ে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে বেবিচকের পাওনা আদায় হবে এবং এয়ারলাইন্সের ওপরও একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।

বেবিচকের বকেয়া তালিকায় রয়েছে বর্তমানে বন্ধ থাকা আরও কয়েকটি দেশীয় এয়ারলাইন্স। জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা প্রায় ৪১১ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মূল বিলের সঙ্গে সারচার্জ বা জরিমানার পরিমাণও বহুগুণ বেড়েছে।

Biman
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ছবি: সংগৃহীত

ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা প্রায় ৩৯১ কোটি এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪৫৪ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে উভয় এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের মূল পাওনার তুলনায় সারচার্জের পরিমাণও বেড়েছে।

বিভিন্ন বিমানবন্দর সেবার বিপরীতে জমে থাকা এসব বকেয়া আদায়ে নিয়মিত তদারকি ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বেবিচক। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, আওতাধীন বিমানবন্দরগুলোর বিভিন্ন খাতের বকেয়া পাওনা আদায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং বকেয়া পরিশোধে ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

এই কর্মকর্তা বলেন, অনেক এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং বকেয়া পরিশোধ নিয়ে আলোচনা চলছে। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত পাওনা আদায় সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী। এভিয়েশন খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বাড়াতে বেবিচকের এ তদারকি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

এদিকে বেবিচকের কাছে বিপুল বকেয়ার মধ্যেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আয় এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। এর আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৮২ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছিল।

আরও পড়ুন

ইউএস-বাংলার বহরে যুক্ত হচ্ছে ২১টি ব্র্যান্ড নিউ বোয়িং

২০২৭ সালে ২০ দেশের ৩০ গন্তব্যে যাবে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট

তবে বিমানের অন্যান্য বকেয়াও রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের বকেয়া ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নতুন করে কেনা জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করলেও আগের বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করেনি বিমান।

পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের বকেয়া জমার শুরু ২০০৯–১০ অর্থবছর থেকে। ২০২০ সালে এই বকেয়া বেড়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ওই সময়ে বিমান প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার জেট ফুয়েল কিনলেও পরিশোধ করত প্রায় ২০ কোটি টাকা।

করোনা মহামারির সময় এভিয়েশন খাতের লোকসানের কথা উল্লেখ করে বকেয়া মওকুফের আবেদন জানিয়ে বিপিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বিমান। তবে সেই আবেদন নাকচ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

এর আগে ২০০৮ সালে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার দেনায় পড়ে বিমান। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদনের পর ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ পায় প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ৫৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে দায়মুক্ত হয়। ২০১৭ সালেও বিমানের প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বকেয়া মওকুফ করেছিল বেবিচক।

তবে এবার সেই ধরনের ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বর্তমানে বিমান ছোট ছোট কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করছে। কিন্তু পদ্মা অয়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে বিমানের পুরোনো বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করতে ১৫ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

ফলে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার একদিকে কাগজে-কলমে মুনাফা, অন্যদিকে বেবিচক ও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া—এই দুই চিত্র বিমানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর