সারাদেশে চলাচলকারী মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের বছরে ১০ হাজার টাকা কর প্রদান করতে হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিলাসবহুল গাড়ি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও (থ্রি-হুইলার) নতুন এই করের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে সংস্থাটি।
বাজেট বৈঠকে প্রস্তাবনা
বিজ্ঞাপন
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বাজেটবিষয়ক বিশেষ বৈঠকে এনবিআর এই প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। বর্তমানে যানবাহন নিবন্ধনের সময় আদায়কৃত রোড ট্যাক্সের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে এই অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য মোটরযানের ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ক্ষমতার ভিত্তিতে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের হার আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সিসির ভিত্তিতে করের হার
এনবিআরের প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের কথা চিন্তা করে ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলকে এই করের আওতার বাইরে রাখা হতে পারে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে হার হতে পারে নিম্নরূপ:
১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত: বার্ষিক ২ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত: বার্ষিক ৫ হাজার টাকা।
১৬৫ সিসির বেশি (উচ্চ ক্ষমতা): বার্ষিক ১০ হাজার টাকা।
এনবিআরের জনৈক কর্মকর্তা জানান, মূলত করের পরিধি বৃদ্ধি এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই অগ্রিম আয়কর বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় করদাতারা সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন।
বিদ্যমান কর কাঠামো ও যানবাহনের পরিসংখ্যান
বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকরা বিআরটিএ-তে নিবন্ধন ফির সঙ্গে রোড ট্যাক্স প্রদান করেন, যা ২ বছরের জন্য ২,৩০০ টাকা এবং ১০ বছরের জন্য ১১,৫০০ টাকা। অন্যদিকে, কার বা জিপের ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ক্ষমতা অনুযায়ী এই বার্ষিক করের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বিআরটিএ-র তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা বর্তমানে ৪৮ লাখেরও বেশি। এছাড়া ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) নিবন্ধিত হয়েছে। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) এক তদন্তে ৩ হাজার সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত ৫,২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের শঙ্কা
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিলাসবহুল বাইক বা উচ্চ ক্ষমতার গাড়ির ওপর বাড়তি কর আরোপ যৌক্তিক। তবে রাইড শেয়ারিং, পণ্য সরবরাহ বা মধ্যবিত্তের পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত বাইকের ওপর কর আরোপ করা হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
আরও পড়ুন: মোটরযানের ট্যাক্স টোকেনে QR কোড: নতুন পদ্ধতি চালু করল সরকার
এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম এই প্রস্তাবকে রাজস্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "বিপুল সংখ্যক মানুষ মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো ঠিক হবে না।"
অন্যদিকে, রাইড শেয়ারিং চালক আলী আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আয় কমেছে কিন্তু খরচ বেড়েছে। এর ওপর যদি বছরে বছর বাড়তি ট্যাক্স দিতে হয়, তবে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। নিরাপত্তা ও গতির জন্য অন্তত ১৫০ সিসি বাইক প্রয়োজন, কিন্তু করের ভয়ে মানুষ কম সিসির বাইক কিনলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।"
অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের জালে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী-
সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: বার্ষিক ৫ হাজার টাকা।
পৌরসভা এলাকায়: বার্ষিক ২ হাজার টাকা।
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায়: বার্ষিক ১ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। সরকার ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ এর মাধ্যমে এগুলোর নিবন্ধন ও ফিটনেস বাধ্যতামূলক করার পথে হাঁটছে। তবে বিপুল সংখ্যক অনিবন্ধিত যানবাহনকে করের আওতায় আনা এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এজেড




