মোটরসাইকেল চালানো কেবল গতির খেলা নয়, বরং এটি একটি শিল্প যেখানে নিয়ন্ত্রণই শেষ কথা। রাস্তাঘাটে আমরা প্রায়ই দেখি অনেক অভিজ্ঞ রাইডারও জরুরি মুহূর্তে বাইক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এর প্রধান কারণ হলো ব্রেকিং এবং গিয়ার পরিবর্তনের সঠিক কৌশল না জানা। বিশেষ করে 'ইঞ্জিন ব্রেকিং' এবং ব্রেকের সঠিক অনুপাত বজায় রাখা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা কাজ করে।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব মোটরসাইকেল রাইডিংয়ের সেই 'গোল্ডেন রুলস' নিয়ে, যা আপনার রাইডিংকে করবে আরও নিরাপদ ও সাবলীল।
বিজ্ঞাপন
১. ব্রেকিংয়ের স্বর্ণালী অনুপাত: ৭০:৩০ নিয়ম
মোটরসাইকেলের সামনের চাকা এবং পেছনের চাকার ব্রেকিং ক্ষমতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেকে ভয়ে সামনের ব্রেক ধরেন না, যা একটি মারাত্মক ভুল।

সঠিক নিয়ম: আদর্শ অবস্থায় বাইক থামানোর জন্য ৭০ শতাংশ সামনের ব্রেক এবং ৩০ শতাংশ পেছনের ব্রেক ব্যবহার করা উচিত। একেই বলা হয় ৭০:৩০ অনুপাত।
বিজ্ঞাপন
কেন সামনের ব্রেক গুরুত্বপূর্ণ? ব্রেক করার সময় বাইকের পুরো ওজন সামনের দিকে চলে আসে, ফলে সামনের চাকা মাটির সাথে বেশি ঘর্ষণ (Grip) তৈরি করে। তবে কড়া ব্রেক করার সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন চাকা লক হয়ে না যায় (যদি বাইকে এবিএস না থাকে)।
২. ইঞ্জিন ব্রেকিং কী এবং কেন করবেন?
ব্রেকিং মানেই শুধু চাকা টেনে ধরা নয়। ইঞ্জিনের শক্তি ব্যবহার করে বাইকের গতি কমানোর পদ্ধতিকেই বলা হয় 'ইঞ্জিন ব্রেকিং'।
কীভাবে কাজ করে: যখন আপনি থ্রোটল বা পিকআপ ছেড়ে দেন এবং এক ধাপ নিচে (Downshift) গিয়ার নামিয়ে আনেন, তখন ইঞ্জিন নিজে থেকেই চাকার গতি কমিয়ে দেয়।
উপকারিতা: এটি ব্রেক প্যাডের ওপর চাপ কমায় এবং খাড়া পাহাড় বা ঢালু রাস্তায় বাইক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ব্রেকের সাথে ইঞ্জিন ব্রেকিংয়ের সমন্বয় করলে বাইক অনেক দ্রুত এবং স্থিতিশীলভাবে থেমে যায়।

৩. ক্লাচ চেপে ব্রেক করার অপকারিতা
আমাদের দেশের অনেক রাইডারের অভ্যাস হলো ব্রেক করার সময় প্রথমেই ক্লাচ চেপে ধরা। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অভ্যাস।
কেন ক্ষতিকর? ক্লাচ চেপে ধরলে ইঞ্জিন চাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বাইকটি 'ফ্রি' হয়ে যায় এবং গতি আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া ক্লাচ চেপে ধরলে ইঞ্জিন ব্রেকিংয়ের সুবিধা পাওয়া যায় না।
সঠিক পদ্ধতি: গতি অনেক কমে না আসা পর্যন্ত ক্লাচ ধরবেন না। প্রথমে থ্রোটল ছেড়ে ব্রেক প্রয়োগ করুন, এরপর ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ক্লাচ চেপে ধরুন।
৪. গিয়ার শিফটিং ও ম্যাচিং (Rev Matching)
গিয়ার পরিবর্তনের সময় হুট করে গিয়ার নামিয়ে দিলে পেছনের চাকা স্কিড (Skid) করতে পারে।
সঠিক নিয়ম: গিয়ার নামানোর সময় সামান্য থ্রোটল দিয়ে ইঞ্জিনের আরপিএম (RPM) বাড়িয়ে গিয়ার পরিবর্তন করুন। একে বলা হয় 'রেভ ম্যাচিং'। এতে গিয়ারবক্সের ক্ষতি হয় না এবং রাইড অনেক স্মুথ হয়।
আরও পড়ুন: যে ৩টি ভুল প্রথম মোটরসাইকেল কেনার আনন্দ মাটি করে দিতে পারে
৫. জরুরি মুহূর্তে ব্রেকিং (Emergency Braking)
হঠাৎ সামনে কিছু চলে আসলে আতঙ্কিত হয়ে ব্রেক কষবেন না।
টিপস: শরীর শিথিল রাখুন, সামনের দিকে তাকিয়ে দুই ব্রেক একসাথে ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে চাপুন। কর্নারিং বা বাঁক নেওয়ার সময় কড়া ব্রেক করা থেকে বিরত থাকুন।
একটি প্রবাদ আছে "যেকোনো কেউ বাইক দ্রুত চালাতে পারে, কিন্তু কেবল দক্ষ রাইডারই জানে কীভাবে তা সঠিকভাবে থামাতে হয়।" মোটরসাইকেলের মেকানিজম বুঝে সঠিক পদ্ধতিতে ব্রেকিং এবং গিয়ার ব্যবহার করলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
এজেড

