বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

জ্ঞানসাধক ড. কাজী দীন মুহাম্মদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ: বহুমাত্রিক জ্ঞানসাধক

ওমর বিশ্বাস
প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ: জীবন, সাহিত্যকর্ম ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
ড. কাজী দীন মুহাম্মদ (জন্ম: ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭; মৃত্যু: ২৮ অক্টোবর ২০১১) ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। শিক্ষা, সাহিত্যে ছিল তার ব্যাপক পদচারণা।

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ (জন্ম: ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭; মৃত্যু: ২৮ অক্টোবর ২০১১) ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। শিক্ষা, সাহিত্যে ছিল তার ব্যাপক পদচারণা। আমাদের সাহিত্যে তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি বহুমাত্রিক বিষয়কে ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি আমাদের একজন অতি মূলব্যান সাহিত্যিক। তিনি সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি ছিলেন একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ। শিক্ষাক্ষেত্রেও তার প্রভূত অবদান রয়েছে এবং তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। অধ্যাপনা পেশা হলেও তিনি জাতির জন্য যথেষ্ট কাজ করেছেন শিক্ষা নিয়ে। তার দ্বারা জাতি উপকৃত হয়েছে।

তিনি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সরাসরি ছাত্র ছিলেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে বলা হয় জ্ঞানতাপস। তার ছাত্র হিসাবে দীন মুহাম্মদ জ্ঞানের মধ্যেই ছিলেন। বলা যায় এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তার যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক। একজন ভাষাতত্ত্ববিদ। আমাদের সাহিত্যে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বই লিখেছেন প্রায় ৪০টির মতো। তার বইগুলো নানা বিষয়ের উপর লিখিত। বাংলা সাহিত্যের উপর তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। তিনি লিখেছেন ধর্মীয় অনুষঙ্গ নিয়ে বিবিধ রচনা। গ্রন্থিত হয়ে আছে এসম্পর্কিত বেশকিছু বই। তিনি রচনা করেছেন চার খণ্ডে “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস”। সাহিত্য বিষয়ক লিখেছেন, “সাহিত্য সম্ভার”, “সাহিত্য শিল্প” “সেকালের সাহিত্য”, “একালের সাহিত্য”, “লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ” নামে বই। ভাষাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে তার “ভাষাতত্ত্ব” নামেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে।  

ইসলাম নিয়ে তার চিন্তা চেতনা ছিল স্পষ্ট। তিনি ব্যক্তি জীবনেও ইসলামকে অনুসরণ করতেন। মানব জীবনের জন্য তা অনুসরণীয় বলেই ভাবতেন। এ বিষয়েও তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। ইসলাম ও ইসলাম সম্পর্কিত তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে “মানবমর্যাদা”, “মানবজীবন”, “জীবন সৌন্দর্য”,  “বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব”। তিনি ইসলাম ও এ কেন্দ্রিক আরো কয়েকটি বই লিখেছেন। তার মধ্যে আছে “নাস্তিকতা ও আস্তিকতা”, “আমি তো দিয়েছি তোমাকে কাউসার” সহ “মহানবীর বাণী শতক”, “বিধান তো আল্লাহরই”, “ছোটদের হযরত মুহাম্মদ সাঃ” এর মতো বই।

ইসলামকে তিনি জীবনের অংশ হিসেবেই মনে করতেন। সংস্কৃতিকে দেখতেন জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে। তুমি সমাজ নিয়ে চিন্তা করতেন। সমাজের উন্নতি অগ্রগতি নিয়ে কাজ করতেন। তিনি সুস্থধারার সংস্কৃতি বিনির্মাণে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এ বিষয়ে তার লিখিত দুটি মূল্যবান গ্রন্থ হলো “ইসলামি সংস্কৃতি” ও “সংস্কৃতি ও আদর্শ”।

তিনি ইসলাম নিয়ে ভাবতেন। ইসলামের সুফিবাদ নিয়েও তার রয়েছে মূল্যবান কাজ। তিনি সূফিবাদ নিয়ে লিখেছেন, “সুফিবাদ ও আমাদের সমাজ”, “সুফিবাদের গোড়ার কথা”র মতো বই।

তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাবিদ ছিলেন। তিনি জীবনের মূল ও মূল্যবান সময়টি ব্যয় করেছেন অধ্যাপনা করে। অবসর নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অধ্যাপনা শুরুও করেছিলেন এখান থেকেই। শেষ বয়সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। তিনি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। একই সাথে বিভিন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। শিক্ষা বিষয়ক তিনি লিখেছেন “শিক্ষা” নামক বই।

তার ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষায় অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সাহিত্যের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন আমৃত্যু। একটি সুন্দর ও আদর্শিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্নই তিনি দেখতেন। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ইতিহাসবিদ, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ভাষাবিজ্ঞানী। সব ক্ষেত্রেই তিনি তার পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এইসব বিষয়ের উপর উল্লিখিত বই ছাড়াও তার আরো বই রয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন খুব সাদাসিধে মানুষ। নিরহংকার মানুষ। মানুষকে তিনি সহজেই আপন করে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাবান এক ব্যক্তি। তার সাহিত্যের উপর পাণ্ডিত্য ছিল প্রগাঢ়। সাহিত্যের খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে জানতেন। সে সম্পর্কিত তার বইগুলোই তার সাক্ষ্য বহন। সেগুলো আমাদের সাহিত্যেকে সমৃদ্ধ করেছে। অথচ আমরা ব্যক্তিপর্যায় তার ও তার সে সব গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্পর্কে যত্নবান নই। অথচ এগুলো সবই আমাদের সাহিত্যের জন্য মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদের মূল্যায়নে আমাদের কৃপণতা রয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্পণ্যের পুরোপুরি দেখিয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন ৬৭ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত। তখনকার দিনে পরিচালক পদটিই ছিল সর্বোচ্চ পদ। সেখান থেকেও তাকে নিয়ে আলোচনা হতে দেখা যায় না।

আমরা ছোটবেলায় আমাদের পাঠবইয়ে কাজীর বিচারের গল্প শুনেছি। গল্পটি ছিল খুবই দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী ও শিক্ষণীয়। যে কাজীকেন্দ্রিক এই মহৎ গল্পটি ড. কাজী দীন মুহাম্মদ সেই কাজী বংশের উত্তরপুরুষ। ইতিহাসের সেই গল্প নারায়নগঞ্জ জেলার। আর তিনি সেই নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের রূপসী গ্রামের সন্তান।

ঢাকার কলাবাগানের নামের ইতিহাসের সাথেও জড়িয়ে আছে তার নাম। ধানমন্ডিতে কলাবাগান রাজধানী ঢাকার একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তার কারণেই আজকের ঢাকার কলাবাগান কলাবাগান হিসেবে পরিচিত। এখানে একরাতে এক হাজার কলা গাছ তার কারণেই লাগানো হয়েছিল। সেই থেকে এখানকার নাম হয়েছিল কলাবাগান। এই কলাবাগানের বাসভবনেই তিনি জীবনের সময়গুলো কাটিয়েছেন। 

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী  ছিলেন। তিনি নিরলসভাবে জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। সাহিত্য কর্ম ও সৃষ্টিতে তার নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল উদ্দীপনামূলক । নিজের কর্মের প্রতি তিনি ছিলেন যত্নশীল। কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নই। নিজের কর্মের প্রতি যত্নশীল নই। যার ফলে আমরা এরকম প্রতিভাধর গুণীদের প্রতি আন্তরিকতা দেখাতে পারছি না। এটা আমদেরই ব্যর্থতা। অথচ গুণীদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যর্থতার দায় আমাদেরই নিতে হবে। আমরা জানি  যে দেশে গুণের কদর নাই সে দেশে গুণী জন্মায় না। এরকমই কথা বলে গেছেন ড. কাজী দীন মুহাম্মদের গুরু জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি আমাদের  শিক্ষা ও সাহিত্যের জ্ঞান সাধক। তাই আমাদেরই প্রয়োজনে আমাদের উচিত  ড. কাজী দীন মুহাম্মদের সাহিত্যকে মূল্যায়ন করা। তার মূল্যবান সাহিত্যকর্ম তুলে ধরা।

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর