শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক প্রফেসর ড. ইয়াসমিন আহমেদ রচিত ‘উপমহাদেশের রাজনীতি: স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক-উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, বর্তমানে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ডীন ড. সৈয়দ আজিজুল হক।
গ্রন্থখানা পাঠ করলে আমাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে জানতে পারি। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়, দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য জানা প্রয়োজন। বিগত শতাধিক বছরে উপমহাদেশের মাটিতে অনেক জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মীদের জন্ম হয়েছে। যারা আমাদের পথকে সমৃদ্ধ করেছেন, পথকে চিনিয়েছেন, তাদের গৌরব গাঁথা জানতে না পারলে ক্ষতি আমাদের নিজেদেরই। গ্রন্থে ২৫ জন উপমহাদেশখ্যাত স্মরণীয় ব্যক্তির জীবন ও কর্মের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। তারা হচ্ছেন শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ, সৈয়দ আহমদ বেরলভি, মহসিন উদ্দিন আহমদ (দুদু মিয়া), রাজা রামমোহন রায়, স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, তিতুমীর, মওলানা শওকত আলী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, সুভাষচন্দ্র বসু, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, মহাত্মা গান্ধী, কায়েদা আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, জহরলাল নেহেরু, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে যাদের অসামান্য অবদান রয়েছে। একটি বৃক্ষের মাটির নিচের অংশ দৃশ্যমান না হলেও সেটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি জাতির ইতিহাস দীর্ঘ। নানা চড়াই উতড়াই এর মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাস নির্মিত হয়। গ্রন্থের ২৫ জন স্মরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীসহ কেউ কেউ বাংলার বাসিন্দা না হলেও বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ভৌগোলিক অর্থে এখন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত স্বাধীন, আলাদা রাষ্ট্র হলেও সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর একাত্মতায়। সঙ্গতকারণে প্রফেসর ইয়াসমিন আহমেদের এই বইখানা অসামান্য।
প্রফেসর ইয়াসমিন আহমেদ এ বিষয়ের উপর দীর্ঘ ৪০ বছরের অধিক কাল ধরে অধ্যাপনা করে যাচ্ছেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান, প্রিন্সিপালসহ নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আমার শিক্ষক। আমি তার ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। ঢাকা কলেজে পড়তে এসে তাকে পেয়েছি। ক্লাসে তার লেখা বই পড়ে আজ আমি এ পর্যায়ে। তিনি দরদ দিয়ে পড়াতেন। শ্রেণিকক্ষে দেখতাম তিনি পড়ানোর বিষয়টা যত দূর সম্ভব চিত্রাকর্ষকভাবে উপস্থাপন করতেন। কোন বিষয়ে পড়ানোর আগে তিনি সেটার ইতিহাস বলতেন। তার লেখা বই আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে। 'উপমহাদেশের রাজনীতি ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব' এই বইখানা তার ব্যতিক্রম নয়। এ বই পড়ে উৎসাহের সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ আজকের নয়, আবহমানকালের বাংলাদেশ। গ্রন্থে উপমহাদেশের রাজনীতির মুক্তির ইতিহাসের ধারাবাহিক বর্ণনা রয়েছে। অসংখ্য বইপত্র থেকে তিনি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে উপস্থাপন করেছেন। উপমহাদেশের অন্যতম শিক্ষাবিদ, দার্শনিক শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পর্যন্ত ২৫ জন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তির অসামান্য অবদানের যে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে তা অপূর্ব, অনন্য। এ গ্রন্থ বাংলাদেশের শতাধিক বছরের রাজনৈতিক মুক্তির সার গ্রন্থ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস জানতে গেলে পড়তে গেলে লিখতে গেলে এই ২৫ জন ব্যক্তির কাছে যেতে হবে।
গ্রন্থের তথ্যাবলি প্রামাণ্য, আকর এবং নির্ভরযোগ্য। গ্রন্থখানার বাধাঁই, কাগজ, প্রচ্ছদ, ছাপা খুবই সুন্দর। গ্রন্থটি শিরোনামের দিক থেকেও সফল ও যথার্থ হয়েছে। এ গ্রন্থ উপমহাদেশের রাজনীতির উপর গ্রন্থাবলির মধ্যে থেকে ব্যতিক্রম বর্ণিল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যেমন- গ্রন্থখানা পাঠ করে সুবিন্যস্তভাবে আমরা অতীতের রাজনৈতিক কৃতী ব্যক্তির কৃতিত্বের খোঁজখবর সম্পর্কে জানতে পারি। তাদের আজকের দিনে জীবিত প্রাসঙ্গিক হিসেবে না পেলেও আমাদের সৃষ্টিশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের কাজের সুফল চিহ্নিত করতে পারি। এই ২৫ জন স্মরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সময়ের চিহ্ন হিসেবে পড়তে পারি। তাদের সমস্যা, প্রশ্নাবলি সম্পর্কে জানতে পারি। এ গ্রন্থের আবেদন সবসময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। এ ধরনের গ্রন্থ পড়ে অতীত ঐতিহ্য নির্মাণ করা, বর্তমানকে বোঝা, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা, নতুন জ্ঞান তৈরি করা, নতুন পর্যালোচনার অধীন করার একটা ভাবালোকতা তৈরি করে দেয়।
বইয়ের নাম: উপমহাদেশের রাজনীতি ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব
প্রথম প্রকাশ: এপ্রিল ১৯৮৭
নতুন সংস্করণ: জুন ২০২৬
প্রকাশক: আনন্দ প্রকাশন, বাংলাবাজার, ঢাকা
প্রচ্ছদ: সৃষ্টি ডিজাইন
মূল্য: ৬৫০.০০ টাকা (ছয়শত পঞ্চাশ টাকা মাত্র)
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২৪
লেখক: নজরুল গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক




