শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

‘মানুষের খাবারের থালার মধ্যেই রাজনীতি লুকিয়ে থাকে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:১৪ এএম

শেয়ার করুন:

‘মানুষের খাবারের থালার মধ্যেই রাজনীতি লুকিয়ে থাকে’

প্রাণ–প্রকৃতি সুরক্ষা বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেছেন, পৃথিবীতে মানুষ একদিকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে, অন্যদিকে নিজেদের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধ ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে। মানুষের খাবারের থালার মধ্যেই রাজনীতি, বাণিজ্য, বৈষম্য ও শোষণের নানা মাত্রা লুকিয়ে থাকে।


শুক্রবার (০৬ মার্চ) রাতে রাজধানীর বনানীতে ‘অন্ন’ আয়োজিত ‘বাংলার নিত্যকার এবং উৎসবের খাবার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলার প্রাকৃতিক কৃষি, খাদ্য ব্যবস্থা ও কৃষকের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। 


বিজ্ঞাপন



অনুষ্ঠানে পাভেল পার্থ বলেন, বাংলাদেশের কৃষি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলা হলেও খাদ্য ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তেমন আলোচনা হয় না। অথচ কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রা— সবকিছু মিলেই একটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য ব্যবস্থার অংশ। নিরাপদ খাবার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই খাবার কার জন্য নিরাপদ? মানুষ, প্রাণী, পাখি বা প্রকৃতির অন্যান্য জীবের জন্য সেটি কতটা নিরাপদ?, সেটিও ভাবতে হবে। কারণ কৃষি শুধু মানুষের জন্য নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।


তিনি আরও বলেন, বাংলার কৃষক ঐতিহাসিকভাবেই বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। বিভিন্ন সময়ে নানা চিন্তাবিদ ও নেতা এই বাস্তবতার কথা বলেছেন। শিল্পী এস এম সুলতানও তাঁর বক্তব্য ও চিত্রকর্মে কৃষকের এই অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। সুলতানের আঁকা কৃষি ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম কৃষির স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি, যেখানে কৃষক ও খাদ্য ব্যবস্থা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলবে।


পার্থ বলেন, বাংলাদেশ একসময় ধান বৈচিত্র্যের জন্য সমৃদ্ধ ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলভেদে হাজারো জাতের ধান চাষ হতো। গভীর পানির ধান, পাহাড়ি জুম ধান, উপকূলীয় ধান—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কৃষি ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বৈচিত্র্যের বড় একটি অংশ হারিয়ে গেছে। কৃষির বর্তমান ব্যবস্থায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যাপক ব্যবহার পরিবেশ ও মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে শুধু পোকামাকড় নয়, মাঠের অনেক প্রাকৃতিক প্রাণী ও উদ্ভিদও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।


প্রাকৃতিক কৃষির প্রতিষ্ঠাতা কৃষক দেলোয়ার জাহান বলেন, স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষির সম্পর্ক না বুঝলে খাদ্য সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, কৃষি ব্যবস্থায় যেভাবে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার বাড়ছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। আগাছা দমনের জন্য যে বিষ ব্যবহার করা হয়, সেটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। গ্রামীণ ভাষায় একে অনেক সময় ‘গুষ্টি মারা বিষ’ বলা হয়, কারণ এটি শুধু আগাছাই নয়, পরিবেশের অন্যান্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।


বিজ্ঞাপন



দেলোয়ার জাহান বলেন, কৃষকরা নানা ঝুঁকি নিয়ে খাদ্য উৎপাদন করেন, কিন্তু তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা এখনও অনিশ্চিত। কৃষির বর্তমান বাস্তবতায় অনেক কৃষকই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পৃথিবীতে মানুষ জন্মের পর প্রথম যে প্রয়োজনটি অনুভব করে তা হলো খাবার। কিন্তু সেই খাবার কোথা থেকে আসে, কীভাবে উৎপাদিত হয় এবং কৃষক কী অবস্থায় তা উৎপাদন করেন— এই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে যথেষ্ট আলোচনা হয় না।


প্রাকৃতিক কৃষি ও স্থানীয় খাদ্য ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই কৃষির পথ খুঁজে বের করার ওপরও জোর দেন বক্তারা। 


বক্তারা বলেন, বাংলার কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় এ অঞ্চলে হাজারো জাতের ধানসহ নানা ধরনের শস্যের সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য ছিল, কিন্তু আধুনিক কৃষি নীতি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক কৃষির প্রসারের ফলে সেই বৈচিত্র্যের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। এতে শুধু কৃষির ঐতিহ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়েছে। বক্তারা বলেন, কৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা।


তারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নীতি নির্ধারণে কৃষক ও প্রাকৃতিক কৃষির বিষয়টি উপেক্ষিত থাকায় কৃষক সমাজ নানা সংকটে পড়েছে এবং মানুষের খাদ্যও ক্রমে রাসায়নিক নির্ভর হয়ে পড়ছে। টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার জন্য স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতির বিস্তার এবং কৃষকের অধিকার রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগের বিষয়ে সমাজে নতুন করে সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারা।

 

এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর