প্রাণের উচ্ছ্বাস, নতুন বইয়ের গন্ধ আর প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ—সব মিলিয়ে অমর একুশে বইমেলা বাঙালির আবেগের এক অনন্য নাম। নবম দিন পেরিয়ে দশম দিনেও এবারের বইমেলায় নেই চিরচেনা দর্শনার্থীদের ভিড়, নেই বিক্রির খাতায় তেমন সাড়া। প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় হতাশ প্রকাশকেরা। তাঁদের ভাষ্য, মেলায় দর্শনার্থীর ভিড় নেই। শুক্রবার ও শনিবার কিছু দর্শনার্থী থাকলেও বাকি দিনগুলোতে থাকে খরা। আবার বইমেলায় দর্শনার্থী কিছু থাকলেও বই কিনছেন কম মানুষ, যা প্রকাশনা খাতের জন্য উদ্বেগের বার্তা।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে আয়োজিত অমর একুশে বইমেলায় এবারও অংশ নিয়েছে দেশের নামকরা প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুরু করে নতুন উদ্যোগে গড়ে ওঠা ছোট প্রকাশকেরা। সাজানো-গুছানো স্টল, নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ আর লেখক-পাঠকদের আগমন কিছুটা থাকলেও বিক্রির অঙ্ক আশানুরূপ নয়। অনেক প্রকাশক জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি কমেছে। আবার কোনো কোনো প্রকাশনীর একেবারেই বিক্রি নেই। অলস বসে সময় পার করতে হচ্ছে বিক্রয়কর্মীদের।
বিজ্ঞাপন
কেউ কেউ বলছেন, প্রতিদিনের বিক্রি দিয়ে স্টল ভাড়া, কর্মচারী ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও এবছর প্রকাশকেরা স্টল বরাদ্দ বিনা মূল্যে পেয়েছেন, কিন্তু শুধু স্টল ফ্রি হলেই তো সব খরচ উঠে আসবে না। এছাড়া বই ছাপানো, বাঁধাই, পরিবহন ও প্রচারণা—সব মিলিয়ে বড় একটি ব্যয় রয়েছে। যদি বিক্রি না হয়, তবে লেখক-প্রকাশকদের সেই বিনিয়োগ পুষিয়ে ওঠা সত্যিই কঠিন। স্টল ফ্রি পেলেও বিক্রি না থাকলে লাভের বদলে লোকসানের হিসাবই ভারী হয়ে উঠবে।
প্রকাশনা শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কাগজের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বইয়ের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বইয়ের দামও বাড়াতে হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ পাঠকের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ পাঠকদের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট বাজেট নিয়ে মেলায় আসছেন এবং একাধিক বই কেনার বদলে একটি বা দুটি বই কিনেই সন্তুষ্ট থাকছেন।
আরও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইনভিত্তিক বিনোদনের বিস্তারে বই পড়ার সময় ও আগ্রহ কমে যাচ্ছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অভিজ্ঞ প্রকাশক। তাঁদের মতে, এখন অনেকেই বইমেলায় ঘুরতে আসেন, ছবি তোলেন, আড্ডা দেন; কিন্তু বই কেনার প্রবণতা আগের মতো নেই। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিজ্ঞাপন
তবে পুরো চিত্র যে একেবারেই মলিন, তা নয়। জনপ্রিয় লেখকদের নতুন বই প্রকাশের দিনগুলোতে নির্দিষ্ট স্টলে ভিড় বাড়ছে এবং বিক্রিও কিছুটা চাঙা হচ্ছে। শিশু-কিশোর সাহিত্য ও সমসাময়িক আলোচিত বিষয়ভিত্তিক বইয়ের প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রকাশকেরা আশা করছেন, মেলার শেষ সপ্তাহ ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পরিবারসহ দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে বিক্রিও বাড়বে। একই সঙ্গে তাঁরা কাগজ ও মুদ্রণ খাতে নীতিগত সহায়তা, কর-সুবিধা এবং পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বইমেলা শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকাশনা শিল্পের জন্য টেকসই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
অনন্য প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আব্দুস সালাম ঢাকা মেইলকে বলেন, এবছর দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম। এর মধ্যে এখন যারা আসছেন, তাঁদের বই কেনার আগ্রহও কম। বই বিক্রি কম হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বই দেখেন, ছবি তোলেন, তারপর রেখে চলে যান।
তরুণ লেখক বিল্লাল হোসেন বলেন, আমার অনেক প্রিয় লেখকের বই এসেছে মেলায়। তাঁরা ইনবক্সে বার্তা পাঠিয়েছেন, মেলায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কেউ জানিয়েছেন, তাঁদের নতুন বই এসেছে; কেউ বলেছেন, স্টলে গিয়ে একটু দেখা করে যেতে। তবুও মন টানে না। মেলায় গেলে দেখতে হবে স্টলের সামনে নেই সেই চিরচেনা ভিড়, নেই বই হাতে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য। মিলছে না লেখক-পাঠক-দর্শনার্থীদের মিলনোৎসব। প্রতি বছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে যে উৎসব আলো ছড়ায়, তা এবার যেন মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করতে পারেনি।
প্রকাশনা সংস্থা স্বপ্ন ৭১-এর স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ গণমাধ্যমকে বলেন, একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই ঠিক আছে। এর বাইরে একুশে বইমেলা আসলে জমবে না। শুক্র ও শনিবার মেলায় লোকসমাগম ভালোই হয়েছিল, তবে রোববার লোকজন একটু কম এসেছে।
জানতে চাইলে প্রকাশক নজরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, বইমেলা নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তনে পাঠকের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। বিশেষ দিন কিংবা ছুটির দিনে মেলায় লোকসমাগম হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে মেলা শুরু না হওয়ায় ঐতিহ্যগত আবহ কিছুটা নষ্ট হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে।
আরেকজন প্রকাশক হাসান মারুফ। এক দশক ধরে প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করছেন তিনি। জানতে চাইলে হাসান মারুফ বলেন, বিশেষ দিনে স্টলে দর্শনার্থীর সমাগম বাড়লেও ক্রেতার আনাগোনা আগের মতো নেই। অন্যান্য বছর বইমেলার কয়েকদিন পার হলেই মেলা জমে ওঠে। এবার ভিন্ন চিত্র, মানুষ আসছেই কম। যে কারণে ছোট ও মাঝারি প্রকাশনীগুলোর জন্য এবারের মেলা পরিণত হয়েছে এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে।
প্রসঙ্গত, সাধারণত প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হলেও এ বছর নির্বাচনের কারণে দেরিতে শুরু হয়েছে বইপ্রেমীদের মিলনমেলার এ উৎসব। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু হয়ে চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ করছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা স্টল রয়েছে।
এসএইচ/এআর

