স্পোর্টস ডেস্ক
২৪ মে ২০২৬, ০২:০৫ পিএম
সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই তরুণ তুর্কিদের পায়ের জাদু আর বিশ্বতারকাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ মাঝেমধ্যে এমন কিছু গল্প তৈরি করে, যা বয়স বা যুক্তি- কোনো কিছুই মানে না। তেমনই এক অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখেছিল আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন এবং তাদের এক ‘বুড়ো’ স্ট্রাইকার। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ঘটেছিল সেই ঘটনা, যা বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে আফ্রিকার ফুটবলকে চিরতরে এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়ে দিয়েছিল।
যার মূল কারিগর ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী এক ফুটবলার, যিনি টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দূরে, এক প্রকার অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন! তিনি আর কেউ নন- আফ্রিকান ফুটবলের কিংবদন্তি রজার মিলা।
রাষ্ট্রপতির একটি ফোন কল এবং অবসর ভাঙা
১৯৮৭ সালেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে রজার মিলা তখন ভারত মহাসাগরের এক ছোট্ট দ্বীপে আধা-পেশাদার ফুটবল খেলে অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপের ঠিক আগে ক্যামেরুন দল যখন প্রস্তুতি ম্যাচে একের পর এক হেরে চরম খেসারত দিচ্ছিল, তখন পুরো দেশজুড়ে দাবি ওঠে মিলাকে দলে ফেরানোর।

শেষ পর্যন্ত খোদ ক্যামেরুনের রাষ্ট্রপতি পল বিয়া সরাসরি রজার মিলাকে ফোন করেন এবং দেশের স্বার্থে অবসর ভেঙে বিশ্বকাপে ফেরার অনুরোধ জানান। রাষ্ট্রপতির অনুরোধ ফেলতে না পেরে ৩৮ বছর বয়সে বুট জোড়া আবার পায়ে গলান মিলা। তবে দলের তৎকালীন সোভিয়েত কোচ ভ্যালেরি নেপোমনিআচসি মিলাকে পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো ফিট মনে করেননি। তাই তাকে দলে রাখা হয়েছিল ‘সুপার সাব’ বা ম্যাচের শেষভাগে নামানোর ট্রাম্প কার্ড হিসেবে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বধ এবং মিলার ম্যাজিক
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ক্যামেরুন। তবে রজার মিলা আসল জাদু দেখায় গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে, রোমানিয়ার বিপক্ষে।
ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধের শেষ দিকে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ৩৮ বছরের মিলা একাই করলেন দুই গোল! ক্যামেরুন ম্যাচ জিতল ২-১ ব্যবধানে। গোল করার পর মিলা কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে ছুটে গিয়ে কোমর দুলিয়ে এক অদ্ভুত ও ছন্দময় আফ্রিকান নাচ নাচলেন, যার নাম ‘মাকোসা ড্যান্স’। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে মিলার সেই নাচ রাতারাতি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক উদযাপনে পরিণত হয়।
কলম্বিয়ার গোলরক্ষকের ভুল এবং কোয়ার্টার ফাইনালের ইতিহাস
রোমাঞ্চের তখনও বাকি ছিল। শেষ ষোলোর ম্যাচে ক্যামেরুনের মুখোমুখি কলম্বিয়া। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এবারও দৃশ্যপটে সেই বুড়ো মিলা! ১০৬ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোল করে ক্যামেরুনকে এগিয়ে দেন তিনি। এর ঠিক ৩ মিনিট পর ঘটে সেই বিখ্যাত কাণ্ড। কলম্বিয়ার কিংবদন্তি ও খ্যাপাটে গোলরক্ষক রেনে হিগুইটা (যিনি পেনাল্টি বক্সের বাইরে এসে ড্রিবলিং করার জন্য কুখ্যাত ছিলেন) বল নিয়ে মাঝমাঠের কাছাকাছি চলে আসেন। মিলা তার অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে হিগুইটার ভুলটি ধরে ফেলেন। চিতার বেগে ছুটে গিয়ে হিগুইটার পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে ফাঁকা পোস্টে বল জড়িয়ে দেন তিনি।

ক্যামেরুন ম্যাচটি জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে। আর এই জয়ের সাথে সাথেই প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়ে ক্যামেরুন। আর সেই গোল নিয়ে পরবর্তীতে মিলা বলেছিলেন, ‘আমি যখন হিগুইটার পা থেকে বলটা কাড়লাম, আমার মাথায় শুধু একটা জিনিসই কাজ করছিল- আজ পুরো আফ্রিকা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আমাকে গোলটা করতেই হবে।’
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে ক্যামেরুনের রূপকথার অবসান ঘটলেও, ততদিনে তারা বিশ্বজয় করে ফেলেছে। পুরো টুর্নামেন্টে ৪টি গোল করে এবং কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে সেই বিখ্যাত নাচ দিয়ে রজার মিলা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করে নেন। এর ৪ বছর পর, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর বয়সেও গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ডটি নিজের করে নেন মিলা।

১৯৯০ সালের ক্যামেরুনের এই অদম্য পারফরম্যান্সের কারণেই পরবর্তীতে বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোটা বৃদ্ধি করা হয়। রজার মিলার সেই রূপকথা প্রমাণ করেছিল যে, ফুটবলে বয়স কেবলই একটি সংখ্যা মাত্র, যদি ভেতরে থাকে দেশের জন্য লড়ার অদম্য ইচ্ছা আর ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা।