ধর্ম ডেস্ক
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১৩ পিএম
ঘুষের আদান-প্রদান অত্যন্ত নিন্দনীয়, গর্হিত ও নিকৃষ্ট অপরাধ। এটি শুধুমাত্র সামাজিক ব্যাধিই নয়, ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া দুটোই শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)
ঘুষের আদান-প্রদানে সমাজে বহুমাত্রিক বিশৃঙ্খলা, বিনাশ, ধ্বংস ও বিপর্যয় নেমে আসে। কেননা এতে অযোগ্য ব্যক্তিও বড় দায়িত্ব পেয়ে যেতে পারে। এতে দেশ ও জাতি মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব গ্রহণকে হাদিস শরিফে কেয়ামতের অন্যতম নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট হয়ে যাবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করবে।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমানত কীভাবে নষ্ট হবে?’ তিনি বললেন, ‘যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করবে।’ (বুখারি: ৬৪৯৬)
আরও পড়ুন: কেয়ামতের আগে যেসব ঘটনা বেড়ে যাবে
অবৈধ পন্থায় অতিরিক্ত কিছু দেওয়া ও নেওয়াকে ঘুষ বলে। এর দুটোই অভিসম্পাতযোগ্য অপরাধ। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত’ (ইবনে মাজাহ: ২৩১৩; আবু দাউদ: ৩৫৮০; তিরমিজি: ১৩৩৬)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামি।’ (মু’জামুল আউসাত: ২০২৬)
এরপরও ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতার মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য সূচিত করে ইসলাম। ঘুষগ্রহীতা সবসময়ই জালেম ও ধোঁকাবাজ বিবেচিত হয়। সে নির্লজ্জ হয়েই ঘুষ চায়, বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ তার থাকে না বলেই সে ঘুষ চায়। তাই তার ঘুষের উপার্জনটি সবসময়ই হারাম ঘোষণা করেছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি তাদের অনেককে দেখবেন, দৌড়ে দৌড়ে পাপে, সীমালঙ্ঘনে ও হারাম ভক্ষণে পতিত হয়। তারা অত্যন্ত মন্দ কাজ করছে।’ (সুরা মায়েদা: ৬২)। ঘুষ গ্রহণ অত্যন্ত ঘৃণ্য হওয়ায় একে কুফরির সঙ্গে তুলনা করে মাসরুক (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘কোনো বিচারক যখন কোনো উপঢৌকন গ্রহণ করে, তখন সে হারাম খায়। আর যখন ঘুষ গ্রহণ করে, তখন কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।’ (সুনানে নাসায়ি: ৫৬৬৫)
আরও পড়ুন: নামাজ না পড়া শিরক, না কুফরি?
বর্তমান সমাজে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার যাদুকরি দিকটি হলো- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেউই এটিকে ঘুষ বলতে চান না। বরং তারা এটিকে অফিস খরচ, বকশিশ, চা-মিষ্টির জন্য হাদিয়া—এসব নামে অভিহিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নাম বদল করে তারা এ অপরাধকে কিছুটা হালকাভাবে দেখতে চান। এজন্যই বুঝি ওমর বিন আব্দুল আজি (রহ) বলেছিলেন, كانة الهدية فى زمن رسول الله هدية، واليوم رشوة. ‘রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে হাদিয়া ছিল; আর এখন তা ঘুষ।’ (বুখারি, ‘হেবা ও তার ফজিলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দরবারে একজন কর্মচারী কিছু মাল এনে বলল, এটা আপনাদের (সরকারি) মাল, আর এটা আমাকে দেওয়া হাদিয়া। রাসুলুল্লাহ (স.) এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সে তার বাবা-মার ঘরে বসে থাকল না কেন, তখন সে দেখতে পেত- তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কি-না? (বুখারি: ২৫৯৭ ‘হেবা ও তার ফজিলত’ অধ্যায়)
কিন্তু ঘুষদাতা অনেকসময় বাধ্য হয়েই ঘুষ দেন। তাই অনন্যোপায় হলে ঘুষ দেওয়া তার জন্য বৈধ হয়ে যায়। যেমন চাকরির ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়া বৈধ হওয়ার জন্য ইসলাম তিনটি শর্ত আরোপ করে। সেগুলো হলো- ১) উক্ত চাকরি করা ছাড়া অন্যকোনো কাজ করার সুযোগ না থাকলে। ২) যথার্থ ও সঠিকভাবে উক্ত চাকরি করার যোগ্যতা ও মানসিকতা থাকলে। ৩) মূল বিলের চেয়ে বেশি বিল কর্মস্থলের তহবিল থেকে গ্রহণ না করলে।
উপরোক্ত শর্তসাপেক্ষে ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়া জায়েজ হতে পারে এবং সেই উপার্জনও হালাল হবে। অন্যথায় উক্ত চাকরি ও সেই উপার্জন হালাল হবে না। তবে, ওই চাকরি নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে এবং অন্য কাজের সুযোগ খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে, তার জন্য দোজখের আগুনই উত্তম।’ (তিরমিজি: ৬১৪)
আরও পড়ুন: ইবাদত কবুল হওয়ার শর্তসমূহ
এভাবে চাকরি ছাড়াও প্রত্যেকটি বিষয়ে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য নিরূপণ করার এখতিয়ার আছে কেবল বড় বিপদের শঙ্কা থাকলে; যেকোনো উপায়ে আত্মরক্ষার সুযোগ থাকলে নয়। কেননা ইসলামি শরিয়তের একটি ভিত্তি হলো সবার আগে আত্মরক্ষা করা, নিজেকে বাঁচানো। এটি অপরিহার্য বিষয়। চাই তা যেকোনো বিষয়েই হোক না কেন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নিজ হাতে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৬)
অতএব সাধারণভাবে ঘুষদাতা ও গ্রহীতা দুজনই লানতযোগ্য হলেও নিজের হক আদায় বা জুলুম থেকে বাঁচতে ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি আলাদা। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মনীষী খাত্তাবি (রহ.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে কিংবা নিজের উপর জুলুম প্রতিহত করতে গিয়ে ঘুষ দেয় তাহলে সে উক্ত সতর্কবাণীর (লানত) অন্তর্ভুক্ত হবে না।’ (মাআলিমুস সুনান: ৫/২০৭)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দিন। ঘুষ দিয়ে যেন চাকরি বা যেকোনো কাজ করতে না হয়, অনন্যোপায় হয়ে করলেও সেখানে যেন স্থায়ী হতে না হয়, সেই রহমত ও তাওফিক দান করুন। আমিন।
(তথ্যসূত্র: রদ্দুল মুখতার: ০৮/৩৪; ইলাউস সুনান: ১৫/৬১; রদ্দুল মুখতার: ০৯/৬০৭; ফাতহুল কাদির: ০৭/২৫৫; আল-বাহরুর রায়েক: ০৬/২৬২)