ধর্ম ডেস্ক
০৯ জুন ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
ইসলামে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম; এটি শৃঙ্খলা, আদব ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনুপম পাঠশালা। একজন মুমিন যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপে বিনয়, শালীনতা ও অন্যের প্রতি সম্মান ফুটে ওঠা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু জুমার দিন বা সাধারণ জামাতে প্রায়ই দেখা যায়, দেরিতে আসা সত্ত্বেও কিছু মুসল্লি কাতার ভেঙে বা অন্য মুসল্লিদের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইবাদতের এই পবিত্র আঙিনায় অন্যকে কষ্ট দিয়ে এমন অগ্রসর হওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য- এ বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
এ বিষয়ে সুনানে আবু দাউদে একটি সুস্পষ্ট ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) বলেন, নবী করিম (স.) এক ব্যক্তিকে জুমার খুতবা দেওয়ার সময় মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে অগ্রসর হতে দেখেন। তখন তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বসো, তুমি মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১১১৮)
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মুসল্লিদের কষ্ট দিয়ে বা কাতার ভেঙে সামনে যাওয়া ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘লা দারার ওয়া লা দিরার’ অর্থাৎ, নিজে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া যাবে না এবং অন্যেরও ক্ষতির কারণ হওয়া যাবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০) অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না। যে অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন; আর যে অন্যের সঙ্গে শত্রুতা করবে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন।’ (সুনানে দারাকুতনি: ৩০৭৯)
আরও পড়ুন: মসজিদের আদব: আল্লাহর ঘরে নিষিদ্ধ ১১ কাজ
ইসলামি ফিকহে এই হাদিসকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। মোল্লা আলী কারি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, শারীরিক, আর্থিক, পার্থিব ও পরকালীন সব ধরনের ক্ষতি এ নীতির অন্তর্ভুক্ত। (মিরকাতুল মাফাতিহ: ৮/৩১৫৬) মসজিদে বসে থাকা মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া, তাদের মনোযোগ নষ্ট করা বা ইবাদতের পরিবেশ বিঘ্নিত করাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তাই মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে বা কাতার ভেঙে সামনে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
ইমাম নববি (রহ.) ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, দেরিতে এসে মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে অগ্রসর হওয়া মসজিদের আদবের পরিপন্থী এবং তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া শরিয়তের সাধারণ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। তাই এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকা উচিত। (ফাতহুল বারি)
ফকিহদের মতে, কেউ দেরিতে মসজিদে এলে তার জন্য করণীয় হলো- যেখানে জায়গা পাওয়া যায় সেখানেই বসে পড়া, অন্য মুসল্লিদের বিরক্ত বা বিভ্রান্ত না করা, কাতার ভেঙে সামনে যাওয়ার চেষ্টা না করা। এটাই মসজিদের আদব ও শিষ্টাচারের দাবি।
আরও পড়ুন: সুন্নত পড়ার সময় জামাত শুরু হলে করণীয়
প্রথম কাতারে নামাজ আদায়ের ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যদি মানুষ জানত আজান ও প্রথম কাতারের সওয়াব কত বড়, তবে তারা (তা পাওয়ার জন্য) প্রয়োজনে লটারি করত।’ (সহিহ বুখারি: ৬১৫)
তবে এই ফজিলত অর্জনের একমাত্র বৈধ পথ হলো আগেভাগে মসজিদে আসা। অন্যকে কষ্ট দিয়ে সামনে যাওয়া এই ফজিলতের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামে মসজিদের আদব রক্ষা করা মর্যাদাপূর্ণ আমল। নামাজের কাতারে অগ্রভাগে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক হলেও তা যেন অন্য মুসল্লিদের কষ্ট বা বিরক্তির কারণ না হয়।
অতএব, দেরিতে মসজিদে এসে কাতার ভেঙে বা মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া শরিয়তসম্মত নয়। বরং যেখানে স্থান পাওয়া যায় সেখানেই শান্তভাবে বসে ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া উত্তম ও আদর্শ আচরণ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি সামনের কাতারে ফাঁকা স্থান থাকে এবং সেখানে পৌঁছাতে অন্য মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া বা তাদের ঘাড়-কাঁধ ডিঙানোর প্রয়োজন না হয়, তাহলে সেই ফাঁকা স্থান পূরণ করার জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া জায়েজ। বরং কাতারের শূন্যস্থান পূরণ করা শরিয়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে যেন কারও শারীরিক বা মানসিক কষ্টের কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: ১১১৮; সহিহ বুখারি: ৬১৫; ইবনে মাজাহ; আল-মাজমু; ফাতহুল বারি; মিরকাতুল মাফাতিহ