আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৩০ পিএম
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ব্লাডব্যাংকের রক্ত নেওয়ার পর এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে পাঁচটি শিশু। এসব শিশুদের সবাই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত, ফলে তাদের নিয়মিত রক্ত নিতে হয়।
রাজ্যের পশ্চিম সিংভূম জেলার সরকারি সদর হাসপাতালের এই ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দন কুমার নিশ্চিত করেছেন, ওই হাসপাতাল থেকে রক্ত নেওয়ার ফলে আট বছরের কম বয়সী ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত পাঁচটি শিশু এখন এইচআইভি পজিটিভ হয়ে পড়েছে।
এদিকে ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর চাইবাসার সিভিল সার্জন, এইচআইভি ইউনিট-এর দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এই ঘটনায় ভুক্তভুগী পরিবারদের দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
ওই শিশুদের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, বর্তমানে তাদের পরিস্থিতির কথা জানার চেষ্টা করেছে।
এর মধ্যে একজন শিশু পশ্চিম সিংভূমের মঞ্ঝরি ব্লকের বাসিন্দা। বছর সাতেকের শশাঙ্ক (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) সংক্রমিত রক্ত সঞ্চালনের ফলে এইচআইভি পজিটিভ হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, এই তথ্য জানাজানি হওয়ার পর গত ৩০ অক্টোবর ওই শিশুর পরিবার চাইবাসায় যে ভাড়া বাড়িতে থাকত সেটা খালি করার কথা বলেন বাড়ির মালিক। চিকিৎসার পাশাপাশি কাছের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্য এই বাড়িতে থাকত শশাঙ্কের পরিবার।
শিশুটির বাবা দশরথ (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) বিবিসিকে বলেছেন, ‘বাড়িওয়ালা বললেন আপনার ছেলে এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে, তাই বাড়ি খালি করে দিন। আমি তাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাড়ি খালি করার বিষয়ে অনড় ছিলেন তিনি। এই অবস্থায় প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে মঞ্ঝরি ব্লকে আমার গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি’।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়ার কারণে মাসে দুইবার ছেলে শশাঙ্কের রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে। এর জন্য এখন তাকে গ্রাম থেকে দু’বার সদর হাসপাতালে যেতে হবে।
দশরথের কথায়, ‘গ্রামে ফেরার পর ছেলের কাছে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা একটা চ্যালেঞ্জ তো বটেই, উন্নত শিক্ষা থেকেও ও এখন বঞ্চিত’।
পেশায় কৃষক এই পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল দশরথের পরিবার। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমার জন্য সমস্যা বেড়ে গিয়েছে। প্রথমে থ্যালাসেমিয়ার মতো একটা রোগ, আর এখন ছেলেকে এইচআইভির বিরুদ্ধেও লড়াই করতে দেখতে হবে’।
শশাঙ্কের মতোই হাটগামহারিয়া ব্লকের বাসিন্দা দিব্যা (পরিবর্তিত নাম) সংক্রমিত রক্ত সঞ্চালনের ফলে এইচআইভি পজিটিভ হয়ে পড়েছে। থ্যালাসেমিয়ার আক্রান্ত এই শিশুর বয়স মাত্র সাত বছর। তার দু'জন বড় ভাই ও বোন রয়েছে।
মা সুনীতা (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) তার বাকি দুই সন্তানকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন যাতে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকে। সুনীতা জানিয়েছেন, দিব্যার থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ার পর থেকেই মেয়ের রক্ত সঞ্চালনের জন্য তিনি মাসে দু’বার প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সদর হাসপাতালে যান।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতি মাসে গাড়ির ভাড়ার ব্যবস্থা করা’।
এই প্রসঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দন কুমারকে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেছেন, ‘আমরা এই পরিবারগুলোর সব সদস্যদের আমাদের ফোন নম্বর দিয়েছি। যখনই তাদের আসা প্রয়োজন, তখনই জেলা প্রশাসনের তরফে গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে’।
সুনীতা অভিযোগ করেছেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি যখন মেয়েকে সদর হাসপাতালে রক্ত দেওয়ার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন দিব্যার প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিবর্তিত আচরণ দেখে তার সন্দেহ হয়।
কান্নাভেজা গলায় তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমার মেয়ের প্রতি স্বাস্থ্যকর্মীদের এই আচরণ দেখে আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার সন্দেহ হয়েছিল যে আমার মেয়ের কিছু একটা হয়েছে’।
তার সন্দেহের বিষয়ে হাসপাতালের কাছে জানতে চাইলে সুনীতাকে স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার বদলে জানানো হয়, রিপোর্ট আসার পরেই কিছু বলা সম্ভব হবে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘গত ৪ অক্টোবর একজন স্বাস্থ্যকর্মী আমাকে বলেছিলেন যে আপনার মেয়েকে ভুল রক্ত দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ও এইচআইভি পজিটিভ হয়ে গিয়েছে’।
সুনীতা বলেন, ‘শুরুর দিকে এর গুরুত্ব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে আমি এইডসের ভয়াবহতা বুঝতে পারছি’। দিব্যাকে রক্ত দেওয়ার সময় চিকিৎসকরা গ্লাভস পরে তাকে স্পর্শ করছিলেন, আর নার্সরা তাকে স্পর্শ করার বিষয়টা এড়িয়েই যাচ্ছিলেন। যা দেখেই তার সন্দেহ হয়।
অন্যদিকে ঝিকপানি গ্রামের একটা খড়ের ছাদ আর মাটির দেয়ালঘেরা বাড়িতে মা শ্রদ্ধার (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) সঙ্গে থাকে শ্রেয়া (পরিবর্তিত নাম)। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রদ্ধার জীবনের একমাত্র ভরসা তার সাড়ে ছয় বছরের মেয়ে শ্রেয়া।
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শ্রেয়ার রক্ত সঞ্চালনের জন্য প্রতি মাসে ২৫ কিলোমিটার দূরে চাইবাসায় সদর হাসপাতালে যেতে হয় তাকে। এর জন্য তাদের প্রতিবার গাড়ি বুক করতে হয় তাদের। এর খরচ বহন করাটা মা শ্রদ্ধার কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এখন শুধু থ্যালাসেমিয়া নয়, এইডসের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে শ্রেয়াকে। শ্রদ্ধা এইডসের বিষয়ে কিছুই জানেন না।
তিনি বলেন, ‘এইচআইভি নিশ্চয়ই একটা গুরুতর রোগ, তাই হাসপাতালের ভুলের জন্য আমি দুই লাখ টাকার চেক পেয়েছি’।
শ্রদ্ধা বা সুনীতা- দুই মায়ের কেউই কিন্তু তাদের সন্তানের এইচআইভি সংক্রমিত হয়ে পড়ার বিষয়ে কিছু জানতেন না। হাসপাতালে ডাক্তার এবং নার্সদের আচরণে পরিবর্তনই তাদের সন্দেহ করতে বাধ্য করে যে তাদের সন্তানরা কোনো গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
অক্টোবর মাসের শেষের দিকে শশাঙ্কের এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার পরে স্থানীয় গণমাধ্যম যখন দশরথের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন এই সন্দেহের বিষয়ে নিশ্চিত হন।
দশরথের কথায়, ‘১৮ অক্টোবর, আমার ছেলেকে রক্ত দেওয়ার আগে, সদর হাসপাতালের ডাক্তার এইচআইভি টেস্ট করেছিলেন। তারপরে ২০ অক্টোবর আমাকে জানানো হয় আমার ছেলে এইচআইভি পজিটিভ। এরপর আমি এবং আমার স্ত্রী একটি এইচআইভি পরীক্ষা করি। পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে। তখন ডাক্তার বলেন, সংক্রামিত রক্তের কারণে আমার ছেলে এখন এইচআইভি পজিটিভ।’
দশরথ এই বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দন কুমারের কাছে অভিযোগ জানান। এরপর বিষয়টা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে যায়। সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট নিজেই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেয়।
এই সময় দশরথ খবর পান যে তার ছেলে এইচআইভি পজিটিভ হয়ে পড়ার কারণে ম্যাজিস্ট্রেট, বিধায়ক এবং সাংসদ তার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।
চন্দন কুমার তাকে জানান আবাসন, রেশন, শৌচালয় তৈরি করে দেওয়ার মতো সব সরকারি প্রকল্পের সুবিধা এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে।
চন্দন কুমারের কথায়, ‘থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত পাঁচজন শিশুর এইচআইভি পজিটিভ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে তাদের পরিবারকে দুই লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে’।
দশরথ দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সাংসদ এবং বিধায়ক এসে দুই লাখ টাকার চেক দিয়েছেন। ঝাড়খণ্ডে এটাই হয়- দরিদ্র বাচ্চাদের জন্য দুই লাখ টাকা, কিন্তু মন্ত্রীর ছেলে হলে সে কোটি কোটি টাকা পেত"।
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, ‘একজন দরিদ্র মানুষের জীবনের মূল্য কি মাত্র দু’লক্ষ টাকা?’
সরকারের কাছ থেকে কী চান এই প্রশ্নের উত্তরে দশরথ বলেন, ‘সরকার যদি সেবাই করতে চায়, তাহলে আমাদের এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিক এবং বাচ্চাদের বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করাক। দোষ যদি সরকারি হাসপাতালের হয়, তাহলে দায়িত্বও তো সরকারেরই’। বিবিসি বাংলা
এমএইচআর