জেলা প্রতিনিধি
২৪ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
ঈদুল আজহার বাকি আর মাত্র ৪ দিন। ঈদের ছুটিতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। তবে ঈদে ঘরমুখী মানুষের জন্য গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় যানজটের শঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। ঈদ এলেই উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলগামী যানবাহন আর যাত্রীদের চাপে অচল হয়ে পড়ে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। অপরিল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, মহাসড়কের পাশে পশুর হাট এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে এমন আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও চালকেরা।
তবে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, শিল্প পুলিশ ও জেলা প্রশাসন বলছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে এবার নেওয়া হয়েছে বিশেষ সমন্বিত প্রস্তুতি।
জানা গেছে, প্রতি ঈদে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ব্যবহার করে বাড়ি ফেরেন। শিল্পাঞ্চলে এখনো ছুটি না হলেও রোববার (২৪ মে) সকাল থেকে গাজীপুরের দুই মহাসড়কেই বেড়েছে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ। পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা হলে মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ বাড়বে। এসব বিষয় বিবেচনা রেখে, এবার পোশাক কারখানা ২৫ ও ২৬ তারিখ দুই ধাপে ছুটি দেওয়া হবে। ঝামেলা এড়াতে অনেকেই আগেভাগেই পরিবার-পরিজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, গাজীপুরে প্রায় তিন হাজার ছোট-বড় শিল্প-কারখানা রয়েছে। একযোগে ছুটি ঘোষণা হলে মহাসড়কে যাতে মানবিক বিপর্যয় না ঘটে, সেজন্য এবার পোশাক কারখানাগুলো ২৫ ও ২৬ মে দুই ধাপে ছুটি দেওয়া হবে। তবে কিছু কারখানা ২৭ মে পর্যন্ত চলবে। ১০-১২টি কারখানায় বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা চলছে, যা মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এবার এই দুই মহাসড়কে ২৫টি যানজট প্রবণ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা উড়ালসড়কের পশ্চিম প্রান্তে চারলেনের মহাসড়ক দুই লেনে এসে মিলিত হওয়ায় প্রতিবারই তীব্র জটলা পাকায়। এছাড়া চন্দ্রায় নির্দিষ্ট কোনো বাস টার্মিনাল না থাকা এবং মহাসড়কের বিভাজক (মিডিয়ান) কেটে যত্রতত্র পারাপারের ব্যবস্থা রাখায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গমুখী যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চন্দ্রা ত্রিমোড়, পল্লী বিদ্যুৎ ও আশপাশের এলাকায় যানবাহন থেমে থেমে চলাচল করছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে সড়কে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। তবে কোথাও যানজট পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ রুটে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী, ভোগড়া, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর বাজার ও জৈনাবাজারসহ অন্তত ২৫টি পয়েন্টে বাজার বসে লেনের সিংহভাগ দখল হয়ে আছে।
এ ব্যাপারে সোহাগ পরিবহনের বাসচালক তমিজ মিয়া বলেন, অবৈধ বাজারের কারণে মহাসড়ক এখনই প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে যদি বৃষ্টি হয়, তবে ভোগান্তি মরণফাঁদে পরিণত হবে।
এদিকে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে গাজীপুর মহানগর ও জেলা এলাকায় সর্বমোট ১১১টি পশুর হাট বসেছে, যার মধ্যে ১৭টিই মহানগরীর ভেতরে এবং বেশ কয়েকটি মহাসড়কের একদম গা ঘেঁষে। আশুলিয়ার শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে মায়ানগর এলাকায় মহাসড়কের পাশেই পশুর হাট বসানো হয়েছে। এসব হাটে পশুবাহী ট্রাকের যাতায়াত ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যেমন, চৌরাস্তা, ভোগড়া ও চন্দ্রা এলাকায় মোট ১৮ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের সহায়তায় নিয়োজিত থাকবে বিজিবি, আনসার ও পুলিশ বাহিনী। চৌরাস্তার যানজট নিরসনে ১০ জন বিজিবি সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম ঢাকা মেইলকে জানান, সম্ভাব্য যানজট নিরসনে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মাঠে রয়েছেন। চন্দ্রার ফুটপাত ও ভাসমান দোকানপাট সকাল থেকেই উচ্ছেদ করা হচ্ছে। মহাসড়কে কোনো বাধা রাখতে দেওয়া হবে না। যানজট তদারকিতে এবার ড্রোনের ব্যবহার করা হবে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর তরিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, পশুর হাটের কারণে কোথাও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ টিম মাঠে থাকবে। এছাড়া জিএমপির নিয়মিত ও অতিরিক্ত পুলিশের সদস্যের পাশাপাশি এবার নতুন করে চার প্লাটুন এপিবিএন সদস্যকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয়েছে। তারা মহাসড়কে যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন।
গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দিন ঢাকা মেইলকে জানান, এ বছরের ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করতে কালিয়াকৈরে চন্দ্রা ও শ্রীপুরের মাওনা এলাকায় জেলা পুলিশের ৮৩৯ জন পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠে উপস্থিত থেকে যানজট যাতে না হয় সে জন্য পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। আশা করা যায়, এবারের ঈদযাত্রা যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঞা সাংবাদিকদের বলেন, ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করছি। পোশাক কারখানাগুলো যাতে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হয়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহাসড়কে ট্রাফিকের যেকোনো অব্যবস্থাপনা, বেশি ভাড়া আদায় সবকিছু তদারক করার জন্য ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত কাজ করবে। ঈদযাত্রায় ঘরে ফেরা মানুষের বাড়তি চাপ সামাল দিতে বিআরটিসির অতিরিক্ত ৫৬টি দ্বিতল এসি বাস নামানো হচ্ছে, যা শ্রমিকদের যাতায়াত অনেকটাই সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/জেবি