শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

জলবায়ু মোকাবিলায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

জলবায়ু মোকাবিলায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চায় বাংলাদেশ
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জনকেন্দ্রিক জলবায়ু নীতি: কপ৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে অতিথি ও অংশগ্রহণকারীবৃন্দ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বাংলাদেশের। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অর্থায়ন অনুদানভিত্তিক করার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জনকেন্দ্রিক জলবায়ু নীতি: কপ৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আগামী জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অবস্থানপত্রের দাবি ও সুপারিশ উপস্থাপন করতে দেশের ৩৩টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এ সংলাপের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে ব্যবধান কমাতে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পর এখন শুধু প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে বাস্তবায়নে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্থায়ন প্রয়োজন। অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলোচনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমাতে উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং অনুদানভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। জলবায়ু নিয়ে কাজ করা তরুণদেরও এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পাটপণ্য তুলে ধরতে একটি বিশেষ ‘জুট প্যাভিলিয়ন’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পাটের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, শিল্পকারখানার নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সমাপনী বক্তব্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ঋণের বোঝা বাড়ায় এমন ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। তাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে অনুদানভিত্তিক আর্থিক সহায়তা আদায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্বাগত বক্তব্যে নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, প্যারিস চুক্তির এক দশক পর বাস্তবায়নে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা পর্যালোচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবে জলবায়ু অর্থায়ন, সমুদ্র অর্থনীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সংলাপে ছয়টি বিশেষায়িত খাতের ওপর তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা দেওয়া হয়। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ বা ৮৪ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে সংগ্রহের প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংলাপে সি৩ইআর-এর রৌফা খানম বৈশ্বিক নিঃসরণের প্রবণতা ও বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি তুলে ধরেন। সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পকারখানার নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মেহজাবিন মাহফুজ ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আব্রার জিশান ও হেলেনা সামুদ্রিক সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন।

তরুণ প্রতিনিধিদের পক্ষে চৌধুরী আব্রার জাহিন, সোহেল বিন সাইফুল্লাহ ও হেলেনা খাতুন জলবায়ু অর্থায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি অর্থায়ন পৌঁছানো, জলবায়ুর কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন এবং নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

জাতীয় জলবায়ু অবস্থানপত্রে ছয়টি প্রধান দাবি ও নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আলোচনায় সরকার ও নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিন্ন অবস্থান বজায় রাখা, কপ৩১-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিবেশবান্ধব দেশীয় পণ্য তুলে ধরা এবং শিল্পকারখানার নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ কমানো।

এ ছাড়া ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, তরুণ ও জলবায়ুতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু অভিবাসীদের নিরাপদ আবাসন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের দাবি জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠন, আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে ৩৩টি সংগঠন যৌথভাবে জাতীয় জলবায়ু অবস্থানপত্রটি তৈরি করেছে।

এতে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, বারসিক, ব্রাইটার্স, সি৩ইআর, কেয়ার বাংলাদেশ, ক্যাপস, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট, সোসাইটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, ফ্রেন্ডশিপ, হেলভেটাস বাংলাদেশ, আইসিসিসিএডি, অক্সফাম, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থা যুক্ত।

এএইচ/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর