বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপাকে পড়বেন সাড়ে ৭ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপাকে পড়বেন সাড়ে ৭ লাখ মানুষ
‘বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন: পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, রিসাইক্লিং এবং বর্জ্যজীবীদের জীবিকার ওপর প্রভাব’ শীর্ষক বর্জ্যজীবীদের সঙ্গে এক পরামর্শ সভা। ছবি: ঢাকা মেইল

দেশে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বর্জ্য সংগ্রহকারীর জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ, বর্জ্যজীবী প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের নেতারা। তারা বলছেন, প্লাস্টিকসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং ও জিরো ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন: পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, রিসাইক্লিং এবং বর্জ্যজীবীদের জীবিকার ওপর প্রভাব’ শীর্ষক বর্জ্যজীবীদের সঙ্গে এক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটি, আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল গ্রিনগ্রান্টস ফান্ড, জিএআইএ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ওয়েস্ট পিকার্স ও বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়ন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সভায় বক্তারা বলেন, দেশে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্যের বাজার রয়েছে এবং প্রতি বছর প্লাস্টিকের চাহিদা প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিকের প্রায় অর্ধেকই পুনর্ব্যবহার করা প্লাস্টিক থেকে আসে। এ অবস্থায় এসব বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে পুনর্ব্যবহার খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি লাখো বর্জ্য সংগ্রহকারীর জীবিকা সংকটে পড়বে। তাই জ্বালানি পুনরুদ্ধারের নামে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়, যা জনস্বাস্থ্য, পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা কিংবা বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জীবিকার ক্ষতির কারণ হয়।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- একেএম মাকসুদ। তিনি বলেন, বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ক্যানসার, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়বে। এছাড়া চার টন বর্জ্য পোড়ালে প্রায় এক টন বিষাক্ত ছাই উৎপন্ন হয়, যা পরিবেশ, কৃষিজমি, বায়ু ও পানির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিংয়ের মাধ্যমে প্রকৃত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ও থ্রি-আর কৌশল বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়নের সভাপতি রীনা বেগম বলেন, তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের বিপক্ষে নন। তবে নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাজ, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কুলসুম বেগম বলেন, তারা ময়লার ভাগাড় থেকে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব উপকরণ পুড়িয়ে ফেলা হলে তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাদের কর্মহীন না করার দাবি জানান তিনি।

বিএমএসএফের নির্বাহী পরিচালক খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, বর্তমানে বিশ্বে বছরে প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলেও বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তাই পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়নের সভাপতি রীনা বেগম, সাধারণ সম্পাদক কুলসুম বেগম, বিএমএসএফের নির্বাহী পরিচালক খায়রুজ্জামান কামাল, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ, গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ রাসুল এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বারিশ চৌধুরী বক্তব্য দেন।

সভায় ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের ভাগাড় এলাকা থেকে ২০ জন বর্জ্যজীবী অংশ নেন। তারা ভাগাড় থেকে বর্জ্য সংগ্রহের অধিকার নিশ্চিত করা, সিটি করপোরেশনে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের দাবি জানান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যমকর্মী এবং অর্ধশতাধিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর