উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম বাংলাদেশ। রোববার (২৪ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যে ফোরামের নেতা এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চল বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশগত চাপের সম্মিলিত অভিঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরতা ও স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে এবং লবণাক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এতে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে।
নিখিল চন্দ্র বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে এবং কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে চিংড়ি, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক মৎস্য রফতানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় অবদান রাখছে। তবুও জাতীয় বাজেটে জলবায়ু ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা ও লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট।
তিনি আরো বলেন, সার্বিক প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় পরিবেশগত সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, টেকসই বাঁধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের আহ্বায়ক আমিনুর রসুল বাবুলের সভাপতিত্বে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলী, গ্রিন ভয়েসের হুমায়ুন কবীর সুমন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, ইয়ুথ ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের আহবায়ক সাদিয়া সুলতান শাপলা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে উপকূল সুরক্ষায় ভুক্তভোগী মানুষ ও সুশীল সমাজের পক্ষের ২১টি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য অবিলম্বে একটি ‘উপকূল উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করতে হবে, যেখানে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য উপকূল ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের জন্য পৃথক দফতর সৃষ্টি করতে হবে, যাতে উপকূলীয় এলাকার টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
২. উপকূলের দীর্ঘ তটরেখা বরাবর পরিবেশবান্ধব ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে হবে এবং ব্লু-কার্বন সংরক্ষণ জোরদার করে কার্বন-ক্রেডিট বিপণনের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংসকারী কোনো প্রকল্প উপকূলে গ্রহণ করা যাবে না; সকল প্রকল্প অবশ্যই পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীসহ সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করতে হবে।
৪. উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বিশেষ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং জাতীয় বাজেটে এর জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. জলবায়ু ঝুঁকি, দারিদ্র্য ও বিপদাপন্নতার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলাসহ অন্যান্য উপকূল-সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও পরিধি বাড়াতে হবে, বিশেষ করে নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
৬. উপকূলীয় এলাকায় ব্লাস্টারভিত্তিক বসবাস পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, এবং বসতি এলাকা বাদ দিয়ে অন্যান্য স্থানে ভূমি উঁচু করণ এবং পলি অবক্ষেপণের জন্য Tidal River Management (TRM) পদ্ধতি চালু করতে হবে।
৭. উপকূলের প্রতিটি বাড়ি দুর্যোগ সহনশীল করার জন্য ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের আদলে ‘একটি বাড়ি, একটি সেন্টার’ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যাতে প্রতিটি পরিবার দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় পায়।
৮. নিয়মিত জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে উপকূলরেখা ও উপকূলীয় এলাকার প্রকৃত আয়তন, স্বাদুপানি, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি উপযোগী (টাউনশিপ) জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ও সমন্বিত ড্রেনেজ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতা দূর করতে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলো অবিলম্বে ড্রেজিং করতে হবে, যাতে নদী ও উপকূলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষিত থাকে।
১০. বর্তমান সাইক্লোন শেল্টারগুলো সংস্কার করে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।
১১. জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি বিবেচনায় স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ করতে হবে এবং ভঙ্গুর স্লুইসগেটগুলো দ্রুত মেরামত ও আধুনিকায়ন করতে হবে। বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও জনগণকে যুক্ত করতে হবে।
১২. উপকূলীয় সকল মানুষের জন্য নিরাপদ খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. উপকূলে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য বৃহৎ জলাধার নির্মাণ করতে হবে, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে বড় দিঘি, খাল ও জলাধারের ইজারা বন্ধ করে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
১৪. ঝড়-ঝঞ্ঝা, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে উপকূল, দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, প্যারাবন বা সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে এবং উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবন সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৫. উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার তিনটি স্তর— কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকরভাবে সচল করতে হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান ও জনবল বাড়াতে হবে।
১৬. উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ায় এমন কার্যক্রম (যেমন: লবণাক্ততা সৃষ্টিকারী চিংড়ি চাষ) সীমিত ও পরিকল্পিত করতে হবে।
১৭. সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য জীবনবীমা, সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক নৌযান ট্রাকিং ব্যবস্থা (VTS), নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া তথ্য ও রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা সরবরাহ করতে হবে।
১৮. উপকূলীয় অঞ্চলে গৃহীত সকল উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও সামাজিক/কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়ন (SIA) বাধ্যতামূলকভাবে প্রণয়ন ও অনুমোদন করতে হবে।
১৯. উপকূলের মানুষের দুর্যোগে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু তহবিল ও ক্ষয়-ক্ষতি তহবিল (Fund for Rresponding to Loss and Damage) দেশে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল করতে হবে ও তাদেরকে জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
২০. উপকূলীয় এলাকায় কৃষি ব্যবস্থাকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে।
২১. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগে দ্রুত সাড়াদানের জন্য স্থানীয় তহবিল এবং WASH অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার পর্যায়ে তহবিল গঠন করতে হবে।
এএম/এফএ




