ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস করে ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ অব্যাহত রাখায় সরকারের অবস্থানকে দ্বিচারিতাপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংগঠনটি বলছে, একদিকে অর্ন্তর্বতী সরকার ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া গণপরিবহনভিত্তিক বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করেছে, অন্যদিকে জনগণের মতামত ও পরিবেশগত উদ্বেগ উপেক্ষা করে পরিবেশবিধ্বংসী ব্যক্তিগত গাড়িকেন্দ্রিক এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়কের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞাপন
আইপিডি জানায়, ঢাকার লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে পরিচিত পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারা। সংগঠনটির মতে, ব্যক্তিগত গাড়িকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নগর পরিকল্পনা করা হলে তা পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়ের পরিপন্থী হয়ে ওঠে।
আইপিডি উল্লেখ করে, পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস বা স্থাপনা নির্মাণ না করার বিষয়ে হাইকোর্টের পূর্বতন নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পরিবেশ আন্দোলনকারীদের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের স্থগিতাদেশ দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছে। আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষ হওয়ার আগেই দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার ফলে পান্থকুঞ্জ পার্ক বর্তমানে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ অধিদফতর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নীরবতাকে বিস্ময়কর বলেও উল্লেখ করেছে আইপিডি। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে নেওয়া পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের সংরক্ষিত জলাধারের ওপর এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু অর্ন্তর্বতী সরকার এ বিষয়ে কোনো সংবেদনশীলতা দেখায়নি। পরিবেশ আন্দোলনকারী, পরিকল্পনাবিদ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহও সরকার দেখায়নি বলে অভিযোগ করেছে আইপিডি।
সংগঠনটি জানায়, সরকারের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বারবার দাবি করেছেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্পে পরিবর্তন বা সংশোধন সম্ভব নয়। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ১২ বছর ধরে চলমান এবং প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প অর্ন্তর্বতী সরকার বাতিল করেছে। এর ফলে একটি গণপরিবহনভিত্তিক প্রকল্প বাতিল হলেও, কেবল একটি সংযোগ সড়ক বাতিলের ক্ষেত্রেও সরকার অনড় অবস্থানে রয়েছে। আইপিডির মতে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই সরকারের দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
আইপিডি আরও অভিযোগ করে জানায়, ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বিদেশি ঠিকাদারদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করছে। এমনকি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এক্সপ্রেসওয়েকে আরও ব্যবহারবান্ধব করার নামে চারটি নতুন র্যাম্প যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। অথচ ঢাকা শহরে বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন উদ্যোগে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি।
আইপিডির বিবৃতিতে বলা হয়, এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের ফলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশ ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংযোগ সড়ক বাস্তবায়িত হলে কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর, কাঠালবাগান, কাঁটাবন, নীলক্ষেতসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিবহন ব্যবস্থা চরম সংকটে পড়বে। এক্সপ্রেসওয়ের ওপর দিয়ে ধনীদের ব্যক্তিগত গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচল করবে, অথচ নিচের বিদ্যমান সড়ক আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
সংগঠনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত ফ্লাইওভার ও উড়াল সড়কের নিচের সড়কগুলো ইতোমধ্যে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একইভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর চলাচলের জন্য ব্যবহৃত সড়ক আরও সংকুচিত হয়ে যাবে।
আইপিডি মনে করে, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করেই এই সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বের কোথাও যানজটের টেকসই সমাধান হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে অবিলম্বে পান্থকুঞ্জ ধ্বংস করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশধ্বংসকারী ও ব্যক্তিগত গাড়িভিত্তিক ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট।
এএইচ/ক.ম

