বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

৯ জানুয়ারি থেকে বাপা-বেনের দুই দিনব্যাপী পরিবেশ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

শেয়ার করুন:

৯ জানুয়ারি থেকে বাপা-বেনের দুই দিনব্যাপী পরিবেশ সম্মেলন

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বেন) দুই দিনব্যাপী বাপা–বেন সম্মেলন ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনিস্টিটিউট (কেআইবি) কনভেনশন সেন্টারে বাপার ২৬তম এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন শুরু হবে সকাল সাড়ে ৯টায়, শেষ হবে পরদিন বিকেল সাড়ে ৫টায়।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সম্মেলনে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পরিবেশবিষয়ক সংস্কার ও করণীয়’।


বিজ্ঞাপন


দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন, পরিবেশ সংরক্ষণে নিয়োজিত বা আগ্রহী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে এতে অংশগ্রহণ করছে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বাপা–বেনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশন নিজ নিজ ক্ষেত্রে পরিবীক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়ন করেছে এবং সেই অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ’ প্রণীত হয়েছে। তবে পরিবেশের বিষয়ে কোনো পৃথক কমিশন না থাকায় দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত পরিস্থিতির সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি এবং পরিবেশ বিষয়ক ভবিষ্যতের জন্য কোনো সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়নি।

নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের পরিবেশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে বিদ্যমান। বিগত কয়েক দশকের অসঙ্গত নীতি এবং অদক্ষ ও অসৎ বাস্তবায়নের কারণে পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কেবল খণ্ডিত প্রয়াস যথেষ্ট নয়; একটি সামগ্রিক মোড় পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সঠিক রূপরেখা। পরিবেশ বিষয়ক পৃথক কমিশন গঠিত না হওয়ার কারণে এ ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ করে পরিবেশ সংস্কারের রূপরেখা এই সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।

নজরুল বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পাবে এবং সমস্যার সমাধান সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বিবিধ প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে সম্মেলনে দেশের পরিবেশ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন।


বিজ্ঞাপন


অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ সংস্কারের ক্ষেত্রে বাপা ও বেন দুটি প্রধান ধারার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একটি হলো নীতির সংস্কার, অন্যটি হলো পরিবেশ বিষয়ক সংস্থার সংস্কার। এ দুই ধারার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় পানি উন্নয়ন, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ, নগরায়ন, পরিবহন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে। পানি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাপা, বেন এবং অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠন বহু বছর ধরে নদনদীর প্রতি বিদ্যমান ‘বেষ্টনী পন্থা’ পরিবর্তন করে ‘উন্মুক্ত পন্থা’ অনুসরণের সুপারিশ করে আসছে।

এই অধ্যাপক বলেন, দীর্ঘ দুই দশকের প্রয়াস এবং অর্ন্তর্বতী সরকারের পানি সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টার বিশেষ উদ্যোগের ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ড চারঘাটে বড়াল নদের মুখে ১৯৮৪ সালে স্থাপিত চার কপাটের স্লুইস গেট অপসারণ করেছে। এর ফলে বড়াল নদে পানি প্রবাহ পুনরায় শুরু হয়েছে এবং চলন বিল অঞ্চলে জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ চার দশক ধরে অবরুদ্ধ থাকা বড়াল নদ আংশিক মুক্তি পেয়ে স্থানীয় জনগণের কাছে একটি অলৌকিক ঘটনার মতো প্রতিভাত হয়েছে। নদনদীর প্রতি উন্মুক্ত পন্থার সুফল এবং শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে এখনও কপাট পুনঃস্থাপনের সুযোগের অপেক্ষা দেখা যাচ্ছে। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেবল নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; পানি উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বাপা-বেনের এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, দেশের জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতেও একই পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বাপা, বেন এবং অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠন বহু বছর ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে আসলেও সরকার ২০০৮ সালে প্রণীত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত বিদ্যুৎ মহা-পরিকল্পনায় কয়লার ব্যবহার ২০১৬ সালের এক শতাংশ থেকে ২০৩০ সালে ৪০ শতাংশে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে। এর ফলে দেশে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বৃহদাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে না এবং অলস ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি চড়াদামে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। ২০২০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ১০ শতাংশ নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তা এক শতাংশের কমে সীমাবদ্ধ থাকে। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে নীতি ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান উভয়েরই মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।

এদিকে বাপা ও বেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরায়ন ও পরিবহন ক্ষেত্রেও নীতি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের সংস্কারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ঢাকার নগরায়ন, ভৌত পরিকল্পনা, যাতায়াত ও পরিবহন সমস্যা শুধুমাত্র ঢাকা-কেন্দ্রিক নীতিমালা ও পদক্ষেপে সমাধানযোগ্য নয়। রাজধানীর জনসংখ্যা অভ্যন্তরীণ বৃদ্ধির চেয়ে পাঁচগুণ বেশি হারে অভিগমনের কারণে বেড়ে গেছে। তাই দেশব্যাপী সুষম উন্নয়ন, নগরায়ন এবং ভৌত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ছাড়া ঢাকা শহরের ‘ফ্লোর-এলাকা-রেশিও’ বা ‘ফার’ সংক্রান্ত সুপারিশ কার্যকর হবে না। রাজউক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা সফলভাবে পালনের চেয়ে ডেভেলপারদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণে না রাখায় সমস্যার প্রকৃত সমাধান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ সম্মেলনে একাডেমিক সেশনের সঙ্গে জেনারেল সেশনও থাকবে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ও বাপার সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, সম্মেলনে পরিবেশ, বন, নদী, জলাশয়, কৃষির ওপর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্রও তুলে ধরা হবে।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্সের ডিন ও বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এবারের সম্মেলনে গত ২৫ বছরের সম্মেলনে প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্ত, প্রবন্ধ সব কটিকে একসঙ্গে সংকলন করে বই আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে, যেটি সংবাদকর্মীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স হিসেবে কাজ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাতটি বিষয়ের ওপর এবারের দুই দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে আছে নদ–নদী ও পানিসম্পদ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, নগরায়ণ ও ভৌত পরিকল্পনা, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি, মৃত্তিকা ও খাদ্যদূষণ, বায়ু, শব্দ ও পানিদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও উপকূল, বন্দর ও সমুদ্র পরিবেশ সুরক্ষা। এ সাতটি বিষয়ের ওপর শতাধিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। 

এএইচ/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর